মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সুদ নিষিদ্ধতার নেপথ্যে: দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজ

Author

Mohammad Nahidul Islam , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৮৯ বার

সুদ নিষিদ্ধতার নেপথ্যে: দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজ

মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম

ইসলামে সুদ বা রিবা নিষিদ্ধ হয়েছে কেবল ধর্মীয় বিধান হিসেবে নয়; এর পেছনে রয়েছে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও টেকসই অর্থব্যবস্থার ভাবনা। রিবার মর্মকথা হলো, ঝুঁকি না নিয়েই মূলধনের ওপর নিশ্চিত বাড়তি অর্থ দাবি করা। এতে ঋণদাতা নিরাপদে লাভ করে, আর প্রয়োজনের চাপে ঋণ নেওয়া মানুষটি ক্রমেই বোঝার নিচে চাপা পড়ে। এই নিষেধাজ্ঞাকে তাই তিনটি স্তরে পড়া যায়: দর্শনের স্তরে সম্পদ ও শ্রমের সম্পর্ক, অর্থনীতির স্তরে ঝুঁকি ও ন্যায্যতার প্রশ্ন, আর সমাজের স্তরে মানুষের পারস্পরিক বন্ধন। কুরআনের ঘোষণা সুস্পষ্ট:
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)

দার্শনিক ভিত্তি:

ইসলামি চিন্তায় অর্থ (Money) নিজে উৎপাদনশীল নয়; সম্পদ জন্ম নেয় শ্রম, উদ্যোগ ও ঝুঁকিগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সুদে ঋণদাতা উৎপাদনে অংশ না নিয়েই নিশ্চিত মুনাফা পায়, ফলে শ্রম ও প্রতিদানের ভারসাম্য ভেঙে যায়। অন্যের অভাবকে পুঁজি করে আয় করা তাই নৈতিকভাবেই অন্যায়। এখানে মানুষে মানুষে সমতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম মর্যাদার মাপকাঠি করেছে সম্পদ নয়, তাকওয়া।
“তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন।”
(সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩)
সুদ এই সাম্যবোধের বিপরীতে দাঁড়ায়। সে সমাজকে ভাগ করে দেয় প্রভাবশালী ঋণদাতা আর নির্ভরশীল ঋণগ্রহীতায়। কুরআন সুদখোরের পরিণতিকে তুলনা করেছে শয়তানের স্পর্শে উন্মত্ত মানুষের সঙ্গে (২:২৭৫)। এই কঠিন উপমা ইঙ্গিত করে, সুদ কেবল লেনদেনের বিষয় নয়; এটি মানুষের সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকেও ক্ষয় করে।

অর্থনৈতিক ভিত্তি :

সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় সময়ের সঙ্গে ঋণ বাড়ে, অথচ ঋণগ্রহীতার আয় নিশ্চিত থাকে না। দুর্যোগ, বাজারমন্দা বা আয়ের ঘাটতিতে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজেই ঋণের ফাঁদে পড়েন। অর্থনীতির সমস্ত ঝুঁকি এভাবে একপক্ষের ঘাড়ে চাপে, আর বৈষম্য গভীর হয়। ইসলাম তাই লাভ ও ক্ষতির যৌথ দায়ভারের নীতি দেয়। কুরআন বলে:
“হে মুমিনগণ, তোমরা দ্বিগুণ-বহুগুণ চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হও।”
(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩০)
“বহুগুণ” শব্দটি কেবল চড়া সুদের সীমারেখা টানে না; আয়াতটি সুদের সামগ্রিক অন্যায়কেই চিহ্নিত করে, যা সূরা বাকারার চূড়ান্ত নির্দেশে পূর্ণতা পায়।
কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ
রিবা সম্পর্কে কুরআনের সবচেয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে সূরা আল-বাকারায়:
“হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও। যদি তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮–২৭৯)
মূলধন ন্যায্য প্রাপ্য, কিন্তু তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৃদ্ধি অন্যায়। হাদিসেও একই সুর ধ্বনিত। আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“সোনার বিনিময়ে সোনা, রুপার বিনিময়ে রুপা, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবণ—সমান সমান ও হাতে হাতে। যে বেশি দিল বা বেশি চাইল, সে সুদে জড়াল; এতে গ্রহীতা ও দাতা উভয়েই সমান।”
(সহিহ মুসলিম)
এ থেকে বোঝা যায়, রিবা কেবল ঋণের বাড়তি অংশে সীমিত নয়; নির্দিষ্ট শর্তে অসম বা বিলম্বিত বিনিময়ও এর আওতায় আসতে পারে।

সামাজিক ভিত্তি :

অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও সুদের সামাজিক প্রভাব আরও গভীর। সুদ সমাজে এমন এক অসম সম্পর্ক তৈরি করে, যেখানে একপক্ষ স্থায়ীভাবে পাওনাদার আর অপরপক্ষ স্থায়ীভাবে দেনাদার। ঋণের চাপে দরিদ্র পরিবারের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়, পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। অন্যদিকে সম্পদ ক্রমে গুটিকয়েক মানুষের হাতে জমা হয়, ফলে সমাজে অবিশ্বাস, বিচ্ছিন্নতা ও শ্রেণিবিভাজন বাড়ে। যে সমাজে একজনের প্রয়োজন আরেকজনের মুনাফার উৎস, সেখানে পারস্পরিক সহমর্মিতা টিকে থাকা কঠিন। ইসলাম সমাজকে দেখে পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন হিসেবে; তাই ঋণের বিপরীতে সে চেয়েছে কর্জে হাসানা, সদকা ও যাকাতের মতো সহমর্মিতার চর্চা, যেখানে প্রয়োজনের মুহূর্তে মানুষ বোঝা নয়, ভরসা হয়ে ওঠে। সুতরাং সুদ নিষিদ্ধতার মূল বার্তা এই যে, অর্থনীতি কেবল মুনাফার হিসাব নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতারও ব্যবস্থা। কুরআন ও হাদিস রিবাকে হারাম করেছে, যাতে কেউ অন্যের দুর্বলতার সুযোগ না নেয় এবং সম্পদ ন্যায্য ও মানবিক পথে প্রবাহিত হয়।

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।