সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সমরদর্শন: যুদ্ধনীতি, রণকৌশল ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত

Author

Mohammad Nahidul Islam , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৯৪ বার

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সমরদর্শন : যুদ্ধনীতি, রণকৌশল ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত–

মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম

 

আরবের উত্তপ্ত মরুভূমি। দিগন্তজুড়ে বালুরাশি, গোত্রে গোত্রে বিরোধ, আর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা এক সমাজ। সামান্য অপমান কিংবা একটি উটকে কেন্দ্র করেও সেখানে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ চলত। এক ব্যক্তির রক্তের বদলা নিতে গিয়ে ঝরে পড়ত অসংখ্য প্রাণ। প্রতিশোধ যেন ছিল বংশপরম্পরায় বহন করা এক অলিখিত আইন।

 

এমন এক সমাজে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটল এক নতুন আদর্শ নিয়ে। তিনি মানুষকে কেবল আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেননি; ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষাও দিয়েছেন। তাঁর জীবনের মদিনা-পর্বে সামরিক সংঘাত যেমন ছিল, তেমনি ছিল কূটনৈতিক সমঝোতা, শান্তিচুক্তি ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার দৃষ্টান্ত।

 

তাঁর সামরিক জীবনকে বুঝতে হলে শুধু যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত বিজয়ের দিকে তাকালে চলবে না। দেখতে হবে, কেন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, কীভাবে তা পরিচালিত হয়েছিল এবং বিজয়ের পর পরাজিতদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল। কারণ, একজন নেতার প্রকৃত পরিচয় কেবল তাঁর সামরিক শক্তিতে নয়; সেই শক্তি ব্যবহারের নীতি ও নৈতিকতার মধ্যেও প্রকাশিত হয়।

 

রাসূল (সা.)-এর সময়ে যুদ্ধের ধরন :

 

মদিনায় হিজরতের পর মুসলমানদের সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। নবগঠিত মুসলিম সমাজকে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়েছিল। কুরাইশদের সঙ্গে সংঘাতসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এই সময়ের ইতিহাস গড়ে ওঠে।

 

ইসলামের ইতিহাসে মহানবী (সা.)-এর সামরিক অভিযানগুলোকে সাধারণত দুটি ভাগে আলোচনা করা হয়।

 

গাজওয়া: যেসব অভিযানে মহানবী (সা.) নিজে উপস্থিত ছিলেন, সেগুলোকে গাজওয়া বলা হয়। প্রচলিত গণনায় এর সংখ্যা ২৭। তবে সব গাজওয়ায় সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। যুদ্ধগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় – ৯ টি যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হলেও বাকি ১৮ টি সন্ধি কিংবা ভিন্ন কারণে সেটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পরিণত হয়নি।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বদর, ওহুদ, খন্দক আহযাব, বনু কুরাইজা, বনু মুস্তালিক, খায়বার, মক্কা বিজয়, হুনাইন, তায়েফ।

মক্কা বিজয়ের সময় কিছু সংঘর্ষ ঘটলেও সামগ্রিকভাবে তা ব্যাপক রক্তপাত ছাড়াই সম্পন্ন হয়। সারিয়্যাহ: যেসব সামরিক অভিযানে মহানবী (সা.) নিজে উপস্থিত না থেকে কোনো সাহাবিকে নেতৃত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সেগুলো সারিয়্যাহ নামে পরিচিত। এসব অভিযানের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট একরকম ছিল না। নিরাপত্তা, সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক সম্পর্কের মতো বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রেখেছিল। গাজওয়া ও সারিয়্যাহর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট – সেই সময়ের সামরিক ইতিহাসকে শুধু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিবরণ দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। চলুন, দেখা যাক – কেমন পলিসি রাসূল (সা.) গ্রহণ করতেন। যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাসূল সা. এর পলিসি :

 

১. আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক নীতি : রাসূল সা. অফেন্সিভ বা আগ বাড়িয়ে কোন যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেননি। প্রত্যেকটা যুদ্ধই ডিফেন্সিভ মুডে ইসলামের প্রাথমিক তেরোটি বছর মক্কায় মুসলমানরা অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেও হাত তোলেননি। মদীনার স্বাধীন রাষ্ট্রে পদার্পণের পর, কেবল তখনই যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যখন মুসলমানদের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলার চক্রান্ত চূড়ান্ত রূপ নেয়। আল-কোরআনের সেই অমোঘ ঘোষণা ছিল-

“যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো হচ্ছে, তাদেরকে (যুদ্ধের) অনুমতি দেওয়া হলো; কারণ তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। আর আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদের সাহায্য করতে সক্ষম।” (সূরা হজ: ৩৯ নং আয়াত)।

 

এই আয়াত ইসলামের প্রাথমিক যুদ্ধনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে মহানবী (সা.)-এর প্রতিটি সামরিক অভিযানকে একই ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করা প্রয়োজন।

 

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে-

 

১. বদর ছিল মদীনা অবরুদ্ধ করার জবাব

২. ওহুদ ছিল মদীনার ওপর কুরাইশদের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ।

৩. খন্দক ছিল সম্মিলিত আরবের এক যৌথ আগ্রাসন।

 

রাসূল (সা.) কখনো নিজে থেকে আগে আক্রমণ করেননি, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল প্রতিরক্ষামূলক। এমনকি যুদ্ধের ময়দানেও আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করে অবতীর্ণ করেন- “আর তোমরা আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তবে তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।” (সূরা বাকারা: ১৯০ নং আয়াত)।

 

২. যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক আচরণবিধি :

 

যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, এই ধারণা মানবসভ্যতার সঙ্গে প্রায় একই বয়সী। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন: যুদ্ধেরও কি কোনো নীতি থাকতে পারে? আজকের বিশ্ব এর উত্তর খুঁজেছে জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে (IHL)। অথচ এই আইনের মূল চেতনার অনেকটাই চৌদ্দশো বছরেরও আগে ইসলামের যুদ্ধনীতিতে স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারিত হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূল সা. যেই মানবিকতা দেখিয়েছেন তা উল্লেখযোগ্য। যেমন :

ক. বেসামরিক, নারী-শিশু ও নিরপরাধ মানুষের সুরক্ষা : ইসলামের যুদ্ধনীতির প্রথম কথাই হলো, লড়াই কেবল তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা সরাসরি লড়ছেন। নারী, শিশু, অতিবৃদ্ধ ও যুদ্ধে অংশ না নেওয়া মানুষের গায়ে হাত তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এক অভিযানে একজন নারীকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নারী ও শিশু হত্যার তীব্র নিন্দা করেন। বর্ণনাটি এসেছে এভাবে-

“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো এক যুদ্ধে একজন নারীকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন তিনি নারী ও শিশু হত্যার তীব্র নিন্দা করেন।” (সহীহ বুখারী, ৩০১৪; সহীহ মুসলিম, ১৭৪৪)। আজকের আইনি পরিভাষায় একেই বলে পার্থক্যের নীতি বা Principle of Distinction। যোদ্ধা ও বেসামরিক মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে এবং বেসামরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো যাবে না।

 

খ. ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও উপাসনালয়ে কোন হামলা করা যাবে না : নিরাপত্তার এই বলয় আরও প্রসারিত হয়েছে। সেনাপতিদের নির্দেশ ছিল-“তোমরা অতিবৃদ্ধ, শিশু ও নারীকে হত্যা করবে না এবং উপাসনালয়ে অবস্থানরত সাধু-সন্ন্যাসীদের হত্যা করবে না” (সুনানে আবু দাউদ, ২৬১৪)।

 

আধুনিক আইনেও ধর্মীয় কর্মীরা বিশেষ সুরক্ষা পান (প্রথম জেনেভা কনভেনশন, ধারা ২৪), আর উপাসনালয়সহ সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় রয়েছে ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন। যাঁরা যুদ্ধের অংশ নন, তাঁদের আঘাত না করার এই বোধ চৌদ্দশো বছরের ব্যবধানে একই সুরে বাঁধা।

 

গ. প্রকৃতি ও অর্থনৈতিক ভিত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা : এই আলোচনার সবচেয়ে সমকালীন অংশটি সম্ভবত প্রকৃতি নিয়ে। ইসলাম যুদ্ধাবস্থাতেও ফসল, গবাদিপশু ও বৃক্ষ ধ্বংস নিষিদ্ধ করেছে। কারণ, এগুলো কেবল শত্রুপক্ষের সম্পত্তি নয়, আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপকরণ। শত্রুর সঙ্গে বিরোধ থাকলেও প্রকৃতির সঙ্গে বিরোধ চলে না। কুরআন এই ধ্বংসকে চিহ্নিত করেছে ফাসাদ বা বিপর্যয় হিসেবে- “আর সে যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন দেশে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করে, ফসল ও বংশধরকে ধ্বংস করে। আর আল্লাহ বিপর্যয় পছন্দ করেন না” (সূরা আল-বাকারাহ, ২০৫ নং আয়াত)। এই নীতির ওপর দাঁড়িয়েই প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) সিরিয়া অভিযানের সময় সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- “তোমরা ফলবান গাছ কাটবে না। জনবহুল এলাকা ধ্বংস করবে না। আর খাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া ভেড়া বা উট জবাই করবে না”(মুয়াত্তা ইমাম মালিক, কিতাবুল জিহাদ, ৯৬৫ নং হাদিস)।

 

আজকের দুনিয়ায় এই কথাগুলোর ওজন অনেক বেড়েছে। বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে, আধুনিক অস্ত্র শুধু মানুষ নয়, জনপদের মাটি-পানি-অরণ্যকেও বছরের পর বছর বিষাক্ত করে রাখতে পারে। ভিয়েতনামে “এজেন্ট অরেঞ্জ” ছিটিয়ে বনভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস করা হয়েছিল, যার ক্ষত প্রজন্ম পেরিয়েও রয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতের তেলকূপে আগুন দেওয়ায় যে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে, তা গোটা অঞ্চলের আকাশ কালো করে দিয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতার পর আন্তর্জাতিক আইন ধীরে ধীরে সেই পথেই এসেছে, যে পথের কথা বহু আগে বলা হয়েছিল। প্রথম অতিরিক্ত প্রোটোকলের ৩৫(৩) ও ৫৫ ধারায় প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক, দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর ক্ষতি নিষিদ্ধ। ৫৪ ধারায় ফসল, গবাদিপশু ও সেচব্যবস্থার মতো নাগরিকদের টিকে থাকার উপকরণ ধ্বংস নিষিদ্ধ, এমনকি অনাহারকে যুদ্ধের কৌশল বানানোও বেআইনি। ১৯৭৭ সালের ENMOD কনভেনশন পরিবেশকে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। রোম স্ট্যাটিউটের ৮(২)(খ)(iv) ধারায় সুস্পষ্টভাবে অতিরিক্ত পরিবেশগত ক্ষতি যুদ্ধাপরাধের মধ্যে গণ্য, আর ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন সশস্ত্র সংঘাতে পরিবেশ রক্ষা নিয়ে একগুচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

 

জলবায়ু সংকট, জীববৈচিত্র্য হ্রাস আর খাদ্যনিরাপত্তার দুশ্চিন্তার এই সময়ে “ইকোসাইড” (Ecocide)-কে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। এই বিতর্কে “ফলবান গাছ কাটবে না” নির্দেশটি কেবল ঐতিহাসিক কৌতূহল নয়, বরং নৈতিক ভিত্তির এক শক্ত সাক্ষ্য। কুরআন প্রকৃতিকে দেখে আমানত ও ভারসাম্যের (মীযান) অংশ হিসেবে, যা টেকসই উন্নয়ন (SDGs) ও ইকোলজিক্যাল জাস্টিসের আধুনিক চিন্তার সঙ্গে সুন্দরভাবে মেলে।

 

ঘ. পলায়নপর, আহত ও আত্মসমর্পণকারীর নিরাপত্তা ইসলামী যুদ্ধনীতির আরেকটি মানবিক স্তম্ভ হলো এই নীতি: যে আর লড়ছে না, সে আর শত্রু নয়। যুদ্ধের ময়দানে কেউ অস্ত্র ফেলে দিলে বা আহত হয়ে পড়লে তিনি আর সক্রিয় যোদ্ধা থাকেন না। হযরত আলী (রা.) সৈনিকদের এই নির্দেশই দিতেন: “তোমরা পলায়নরত কাউকে ধাওয়া করবে না, আহত কাউকে শেষ করে দেবে না এবং যে অস্ত্র সমর্পণ করবে সে নিরাপদ”(মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে এই ধারণার নাম “Hors de combat” অর্থাৎ যুদ্ধের বাইরে চলে যাওয়া ব্যক্তি। আহত, অসুস্থ বা আত্মসমর্পণকারীর ওপর আক্রমণ নিষিদ্ধ (প্রথম অতিরিক্ত প্রোটোকল, ধারা ৪১; প্রথম ও দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশন)। “কাউকে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে না” (No quarter) ধরনের ঘোষণাও নিষিদ্ধ, আর বন্দিদের সঙ্গে আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় তৃতীয় জেনেভা কনভেনশনে। এখানে মূল শিক্ষা হলো, সামরিক প্রয়োজনের নামে সব ধরনের ধ্বংসযজ্ঞকে বৈধ ধরে নেওয়া যায় না। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত সীমা থাকা প্রয়োজন।

 

৩. কূটনীতি ও শান্তিচুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া:

যুদ্ধের পাশাপাশি মহানবী (সা.)-এর রাষ্ট্রনায়কত্বে কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শত্রুপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হলে তা বিবেচনা করা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কুরআনে ইরশাদ করা হয়েছে – “আর যদি তারা শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝুঁকে পড়ো এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (সূরা আল-আনফাল, ৮:৬১)। এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হুদাইবিয়ার সন্ধি। ষষ্ঠ হিজরিতে মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করেন। কিন্তু কুরাইশদের সঙ্গে বিরোধের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ আলোচনার পর একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির কিছু শর্ত সাহাবিদের কাছে প্রথমে কঠিন মনে হয়েছিল। তবু মহানবী (সা.) তা গ্রহণ করেন তাৎক্ষণিক দৃষ্টিতে এই সন্ধিকে মুসলমানদের জন্য কঠিন সমঝোতা মনে হলেও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এর কৌশলগত গুরুত্ব প্রকাশিত হয়। শান্তিপূর্ণ যোগাযোগের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং ইসলামের দাওয়াত বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। দুই বছর পর মক্কা বিজয়ের ইতিহাসও এই বৃহত্তর ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কুরআনে সূরা আল-ফাতহের শুরুতে ইরশাদ হয়েছে- “নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি” ( সূরা আল-ফাতহ, ৪৮:১)।

হুদাইবিয়ার সন্ধি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়- সব বিজয় যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না। কখনো কখনো আলোচনার টেবিলে নেওয়া একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পথ তৈরি করে।

৪. যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে আচরণ :

যুদ্ধ থামলে আসল পরীক্ষা শুরু হয় বন্দিদের নিয়ে। সপ্তম শতকের আরবে বন্দির ভাগ্য প্রায়ই ছিল হত্যা, দাসত্ব কিংবা মুক্তিপণের অপেক্ষা। বদরের প্রান্তরে বিজয়ের পর মদীনার মুসলিমরা দেখালেন ভিন্ন এক নজির। প্রায় সত্তরজন কুরাইশ বন্দি এলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দেন- “বন্দিদের সঙ্গে সদয় আচরণ করো”(তাবারানী, আল-মু’জামুস সাগীর)।

 

আরো কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক :

ক. নিজেরা খেজুর খেয়ে বন্দিকে রুটি

এই নির্দেশ কেবল কথায় থাকেনি। বদরের বন্দি আবু আযীয ইবনে উমাইর (মুস’আব ইবনে উমাইরের ভাই) পরে স্মৃতিচারণ করেছেন, যে আনসার পরিবারে তিনি ছিলেন, তাঁরা সকাল-সন্ধ্যার খাবারে তাঁকে দিতেন রুটি, আর নিজেরা খেতেন খেজুর। কারণ ছিল রাসূলের ওই নির্দেশ। রুটি তখন খেজুরের চেয়ে তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও বিরল খাবার। অর্থাৎ বন্দি পেয়েছিলেন নিজেদের চেয়েও ভালো খাবার। কুরআন বন্দিকে অন্ন দেওয়াকে সৎকর্মশীলদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেন- “আর তারা খাদ্যের প্রতি নিজেদের ভালোবাসা সত্ত্বেও তা মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দিকে খাওয়ায়”( সূরা আদ-দাহর, আয়াত ৮)। আর বন্দির পরিণতি নিয়েও কুরআনের দিকনির্দেশ স্পষ্ট- হয় অনুগ্রহ করে মুক্তি, নয় মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি- “অতঃপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ”( সূরা মুহাম্মদ, আয়াত ৪)।

 

খ. শিক্ষাদানের বিনিময়ে মুক্তি:

বদরের অনেক বন্দি মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে যান। কিন্তু যাঁদের সেই সামর্থ্য ছিল না, তাঁদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) দিলেন এক ভিন্ন ব্যবস্থা। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন- “বদরের দিন কিছু বন্দির মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের মুক্তিপণ ঠিক করলেন আনসারদের সন্তানদের লেখা শেখানো”( মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২১৬)। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এভাবেই লেখাশিক্ষা লাভ করেন।

ভেবে দেখুন দৃশ্যটি। কয়েকদিন আগে যাঁরা রণাঙ্গনে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরাই এখন মদীনার শিশুদের সামনে বসে লেখা শেখাচ্ছেন। যুদ্ধের ময়দান রূপ নিল পাঠশালায়, বন্দিত্ব হয়ে উঠল জ্ঞান বিলানোর সুযোগ। নবীন মুসলিম সমাজ পেল লেখাপড়ার সম্পদ, আর বন্দি পেলেন মর্যাদা ও স্বাধীনতার পথ। এখানে শাস্তির চেয়ে বড় ছিল সমাজ গড়ার দৃষ্টি।

 

৫. প্রতিশোধের পরিবর্তে সাধারণ ক্ষমা জারি :

মহানবী (সা.)-এর সামরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মক্কা বিজয়। অষ্টম হিজরিতে সংঘটিত এই বিজয় ব্যাপক সামরিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। তবে ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ রক্তপাতহীন বলা সঠিক নয়; মক্কায় প্রবেশের সময় কিছু স্থানে সংঘর্ষ ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে বিজয়ের পর ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মক্কা ছিল সেই নগরী, যেখানে মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীরা দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। মুসলমানদের একসময় নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে মদিনায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই মক্কাই যখন তাঁর নিয়ন্ত্রণে এল, তখন অতীতের প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিজয়ের পর প্রতিশোধকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত করা হয়নি। মক্কা বিজয়ের বর্ণনায় নিরাপত্তা প্রদান এবং সাধারণ ক্ষমার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সহিহ মুসলিমে মক্কায় প্রবেশের সময় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঘোষণার বিবরণ রয়েছে, যার মধ্যে নিজ গৃহে অবস্থানকারী এবং আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশকারীদের নিরাপত্তার কথাও উল্লেখিত হয়েছে।এই ঘটনা কেবল ক্ষমার আবেগঘন দৃষ্টান্ত নয়; এর মধ্যে রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও রয়েছে। দীর্ঘ সংঘাতের পর একটি সমাজকে পুনর্গঠন করতে হলে প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা ভাঙা জরুরি। অন্যথায় বিজয়ী ও পরাজিতের বিভাজন ভবিষ্যতের নতুন সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে। মক্কা বিজয়ের তাৎপর্য তাই শুধু একটি নগরীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নয়; বরং সেই কর্তৃত্বের অধীনে নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যেও নিহিত।

 

মহানবী (সা.)-এর যুদ্ধনীতির ঐতিহাসিক মূল্যায়ন :

মহানবী (সা.)-এর সামরিক জীবন নিয়ে আলোচনায় নিহত মানুষের সংখ্যা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। কোনো কোনো আধুনিক লেখায় তাঁর মদিনার জীবদ্দশায় সংঘটিত সামরিক সংঘাতে উভয় পক্ষের মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার বা তার কিছু বেশি বলে দাবি করা হয়। তবে এই হিসাব সর্বসম্মত নয়। কোন কোন সংঘাতকে গণনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং প্রাচীন সূত্রে সংখ্যাগুলো কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তার ওপর হিসাবের পার্থক্য নির্ভর করে। তাই তাঁর যুদ্ধনীতির মূল্যায়ন শুধু নিহতের সংখ্যা দিয়ে করা যথেষ্ট নয়। বরং বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যুদ্ধের সময় কী নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল, বন্দিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছিল, চুক্তির গুরুত্ব কতটা দেওয়া হয়েছিল এবং বিজয়ের পর পরাজিতদের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর সামরিক জীবনের কঠিন ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোকেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা জরুরি। বনু কুরাইযার ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে প্রথাগত ইসলামী বর্ণনা, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণায় বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। সুতরাং ইতিহাসকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে হলে কেবল প্রশংসনীয় ঘটনাগুলো তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; জটিল ঘটনাগুলোকেও তথ্য ও প্রেক্ষাপটের আলোকে আলোচনা করতে হবে।

 

এ ধরনের সতর্কতা মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শের গুরুত্ব কমায় না; বরং ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।

 

মরুভূমির সেই আরব আজ আর নেই। বদলে গেছে যুদ্ধের ধরন, সামরিক প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রের কাঠামো। কিন্তু ক্ষমতা, প্রতিশোধ, নিরাপত্তা ও মানবিকতার প্রশ্নগুলো আজও পৃথিবীর সামনে উপস্থিত। ইতিহাসের মরুপ্রান্তর পেরিয়ে তাই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কি কেবল তার অস্ত্রে, নাকি সেই অস্ত্র ব্যবহারের নৈতিক সংযমেও? মহানবী (সা.)-এর সামরিক জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শক্তি দিয়ে বিজয় অর্জন করা যায়, কিন্তু ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা দিয়েই সেই বিজয়কে ইতিহাসে অর্থবহ করে তোলা যায়।

 

লেখক :

মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম

শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।