মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ভাইরাল সংস্কৃতি: পরিচিতিই এখন সাফল্যের নতুন মাপকাঠি?

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

ভাইরাল সংস্কৃতি: পরিচিতিই এখন সাফল্যের নতুন মাপকাঠি?

সাফল্যের মৌলিক সংজ্ঞা হয়তো দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, দক্ষতা, জ্ঞান ও অর্জন। একজন লেখক পরিচিত হতেন তাঁর লেখার মাধ্যমে, শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মে, শিক্ষক তাঁর জ্ঞান ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে, আর উদ্যোক্তা তাঁর প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে। পরিচিতি ছিল সাফল্যের ফল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সেই সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিতি নিজেই যেন সাফল্যের মাপকাঠিতে পরিণত হচ্ছে। কে কতটা পরিচিত, কতজন তাকে অনুসরণ করে, একটি ভিডিও কতবার দেখা হয়েছে কিংবা একটি পোস্ট কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এসব দিয়ে অনেক সময় মানুষের গুরুত্ব বিচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। ডেটারিপোর্টালের ‘ডিজিটাল ২০২৬: বাংলাদেশ’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর নাগাদ বাংলাদেশে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী পরিচয় ছিল। একই সময়ে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮২.৮ মিলিয়ন। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন সমাজের একটি বড় অংশের দৈনন্দিন জীবন, যোগাযোগ ও তথ্যগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত। এই বিশাল ডিজিটাল পরিসরে মানুষের মনোযোগ হয়ে উঠেছে এক ধরনের সম্পদ। একটি পোস্ট যত বেশি মানুষের চোখে পড়ছে, সেটি তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ । এমন একটি ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। ফলে ‘ভাইরাল’ শব্দটি শুধু কোনো কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অর্থে সীমাবদ্ধ থাকছে না; অনেকের কাছে এটি হয়ে উঠছে সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীক। সমস্যা হয়তো এখানেই। ভাইরাল হওয়া এবং মূল্যবান হওয়া এক বিষয় নয়। একটি হাস্যরসাত্মক ভিডিও কয়েক ঘণ্টায় লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। আবার কোনো গবেষকের বহু বছরের গবেষণা হয়তো খুব অল্পসংখ্যক মানুষ পড়বেন। কোনো বই হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলবে না, অথচ সেটি একজন পাঠকের চিন্তাজগৎ বদলে দিতে পারে। কোনো শিক্ষক হয়তো কখনো ভাইরাল হবেন না, কিন্তু তাঁর একটি বাক্য একজন শিক্ষার্থীর জীবনকে নতুন দিশা দেখাতে পারে। তাই মানুষের প্রকৃত অবদানকে শুধু দৃশ্যমানতার সংখ্যায় মাপা হলে সমাজে সাফল্যের সংজ্ঞাই সংকুচিত হয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। সেখানে সাধারণত মানুষের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে এমন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। আগে একজন শিল্পী, লেখক, উদ্যোক্তা বা শিক্ষককে পরিচিত হতে নির্ভর করতে হতো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যমের ওপর। এখন একজন তরুণ নিজের কাজ সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। ভালো কনটেন্টের মাধ্যমে ছোট শহরের একজন মানুষও বৃহৎ পরিসরে পরিচিত হতে পারেন। এই সুযোগকে খাটো করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু পরিচিতি যখন যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। অনুসারীর সংখ্যা বেশি হলেই কেউ বিশেষজ্ঞ হয়ে যান না। লাখো মানুষ কোনো বক্তব্য দেখেছে বলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বলেই তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ—এমন ধারণা বিপজ্জনক। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা সামাজিক বিষয়ে যাচাইহীন তথ্য ভাইরাল হলে তার প্রভাব ব্যক্তিগত পর্যায় ছাড়িয়ে সমাজেও পড়তে পারে। তথ্যগ্রহণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রে পিউ রিসার্চ সেন্টার এর ২০২৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ২১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘নিউজ ইনফ্লুয়েন্সারদের’ কাছ থেকে খবর পান; ১৮–২৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ। জরিপে আরও দেখা যায়, ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছ থেকে খবর পাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে বিষয়টি সক্রিয়ভাবে খোঁজার চেয়ে সামনে চলে আসার ফল। অর্থাৎ মানুষ এখন শুধু সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানভিত্তিক উৎসের ওপর নির্ভর করছে না; ব্যক্তির পরিচিতিও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি অনানুষ্ঠানিক সংকেত হয়ে উঠছে। অথচ পরিচিতি ও নির্ভরযোগ্যতা এক জিনিস নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় তরুণদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের দৃশ্যমান অংশ দেখে নিজের জীবনকে তার সঙ্গে তুলনা করা সহজ। কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে, কেউ বিদেশে গেছে, কেউ রাতারাতি জনপ্রিয় হয়েছে—এসব দৃশ্য বারবার সামনে আসতে থাকলে মনে হতে পারে, দ্রুত পরিচিত হওয়াই জীবনের প্রধান লক্ষ্য। ধৈর্য, দীর্ঘমেয়াদি শেখা, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া কিংবা নীরবে দক্ষতা অর্জনের মতো বিষয়গুলো তখন তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। অথচ একটি সুস্থ সমাজে সব সাফল্য দৃশ্যমান হয় না। গবেষণাগারে কাজ করা বিজ্ঞানী, শ্রেণিকক্ষে পড়ানো শিক্ষক, মাঠে কাজ করা কৃষক, রোগীর সেবা দেওয়া নার্স, পরিবারের যত্ন নেওয়া মানুষ কিংবা বছরের পর বছর দক্ষতা অর্জনে ব্যস্ত তরুণ তাঁদের অনেকেই ভাইরাল নন। কিন্তু সমাজের অগ্রগতিতে তাঁদের অবদান অপরিসীম।
তাই প্রশ্নটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভালো না খারাপ, এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা সাফল্যের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করছি। পরিচিতি অবশ্যই মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন যোগ্যতা, সততা, পরিশ্রম ও বাস্তব অবদানের জায়গা দখল না করে। ভাইরাল হওয়া একটি মুহূর্তের ঘটনা; প্রকৃত সাফল্য অনেক সময় দীর্ঘ যাত্রার ফল। তাই আমাদের এমন সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পরিচিতির চেয়ে অবদান, অনুসারীর সংখ্যার চেয়ে দক্ষতা এবং ভাইরাল হওয়ার চেয়ে স্থায়ী মূল্য সৃষ্টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।