সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

তথ্যের বন্যায় সত্যের সংকট

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৯৫ বার

তথ্যের বন্যায় সত্যের সংকট

মানবসভ্যতার ইতিহাসে তথ্য সবসময়ই শক্তির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। জ্ঞান, শিক্ষা, গবেষণা এবং সামাজিক অগ্রগতির পেছনে তথ্যের ভূমিকা অনেক। তবে তথ্যের মূল্য কেবল তার প্রাচুর্যে নয়, বরং তার সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার মধ্যে নিহিত। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে তথ্যের প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও। ডিজিটাল যুগে সত্যকে খুঁজে বের করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, আর এই বাস্তবতা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় তথ্য ছিল সীমিত, কিন্তু সত্যকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হতো না। আজকের প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আমরা এমন একটি যুগে বসবাস করছি, যেখানে হাতে থাকা এনড্রয়েড ফোনটি খুললেই কোটি কোটি তথ্য, ছবি, কমেন্ট ও ভিডিও আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর জানা যাচ্ছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব বিস্তারের মধ্যেই একটি গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। সেটি হলো সত্যের সংকট। তথ্যের প্রাচুর্তা যত বেড়েছে, সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় হয়ে উঠেছে ততই কঠিন। আজকের ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্যের সহজলভ্যতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্লগ, ইউটিউব ভিডিও এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ এখন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের আড়ালে তৈরি হয়েছে নতুন এক বিপদ। এখন যে কেউ খুব সহজে কোনো তথ্য প্রচার করতে পারে, অথচ সেই তথ্য কতটা সত্য বা নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করার কোনো প্রয়োজন দেখা যায় না। ফলে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাও সমান গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সত্যের চেয়ে জনপ্রিয়তাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। যে তথ্য বেশি উত্তেজনা (বেশি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার) তৈরি করে, বেশি প্রতিক্রিয়া পায়, সেটিই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সঠিক তথ্যের চেয়ে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুজব ও ভুয়া তথ্যের কারণে সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও নজিরবিহীন নয়। একটি বিকৃত ছবি, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও বা একটি ভিত্তিহীন পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের পূর্বেই ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়ে যায়। এই বাস্তবতা দেখিয়ে দেয় যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ সবসময় জ্ঞান বৃদ্ধি করে না; কখনো কখনো তা সংকটের জন্ম দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন প্রযুক্তির সাহায্যে এমন ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখতে এবং শুনতে বাস্তব মনে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেগুলি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তির অপব্যবহার বাড়লে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা আরও অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তথ্যের বন্যার আরেকটি বড় সমস্যা হলো ‘তথ্য ক্লান্তি’। প্রতিদিন এত বেশি তথ্যের মুখোমুখি হতে হয় যে অনেক মানুষ গভীরভাবে চিন্তা করার পরিবর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। শিরোনাম দেখেই মতামত তৈরি হচ্ছে, তথ্য যাচাই না করেই তা শেয়ারের পর শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি দুর্বল হচ্ছে এবং জনপরিসরে যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া ক্রমশ বাড়ছে। এই সংকটের দায় প্রযুক্তির নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের। আমরা অনেক সময় কোনো তথ্যের উৎস যাচাই করি না, বিভিন্ন মতামত বিবেচনা করি না এবং নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিল থাকলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নিই। মনোবিজ্ঞানীরা একে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ বলেন। অর্থাৎ মানুষ এমন সকল তথ্যকেই বেশি বিশ্বাস করতে চায়, যা তার পূর্বধারণাকে সমর্থন করে। ফলে সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে নিজের বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন তথ্যসচেতনতা ও আত্মসচেতনতা। নাগরিকদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভুয়া খবর শনাক্ত করতে হয় এবং কীভাবে দায়িত্বশীলতার সহিত তথ্য ব্যবহার করতে হয়। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষামূলক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তথ্যসচেতনা গড়ে তোল আবশ্যক । একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষতা, তথ্যনির্ভরতা এবং পেশাগত নীতিমালার প্রতি আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় তথ্য নিঃসন্দেহে একটি শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা সত্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তথ্যের আধিক্য নিজেই কোনো অর্জন নয়; প্রকৃত অর্জন হলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন । যদি তথ্যের স্রোতে সত্য হারিয়ে যায়, তাহলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সত্ত্বেও সমাজ বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। একটি সুস্থ, সচেতন ও গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে সত্যের ওপর; আর সেই সত্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ডিজিটাল যুগের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এবং ব্যক্তি সচেতনতাই এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম পদক্ষেপ। তাই প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ও সচেতন ব্যবহার। তথ্যের জগতে সক্রিয় প্রতিটি নাগরিক যদি যাচাই-বাছাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তবে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে। সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং তথ্য ব্যবহারে নৈতিকতা, এই তিনটি গুণই হতে পারে ভবিষ্যৎ সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ থামবে না, বরং আরও বৃদ্ধি পাবে। সেই বাস্তবতায় আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তথ্য সংগ্রহের চেয়ে সত্যকে শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়া।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আজকালের খবর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।