স্মার্টফোন স্মার্ট করেছে, নাকি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে?
স্মার্টফোন স্মার্ট করেছে, নাকি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে?
সকালে ঘুম থেকে উঠেই মুঠোফোনের পর্দায় চোখ রাখা, অবসরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবিরত স্ক্রল করা, পড়তে বসে বারবার নোটিফিকেশন চেক কিংবা রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে রিলস্ বা চ্যাটিং — আধুনিক জীবনের পরিচিত চিত্র এগুলো। যে স্মার্টফোন একসময় যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তা এখন শিক্ষা, বিনোদন, অর্থ লেনদেন, সংবাদপাঠ ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু এই প্রযুক্তির বহুমুখী সুবিধার ভিড়ে একটি প্রশ্ন ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন কি আমাদের আরও স্মার্ট করেছে, নাকি প্রযুক্তির প্রতি অত্যধিক নির্ভরতা বাড়িয়েছে? স্মার্টফোনের উপযোগিতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। মুহূর্তেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের তথ্য জানা, অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়া, ডিজিটাল লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করা কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে এই যন্ত্রের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্মার্টফোনের গুরুত্ব আরও ব্যাপক। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা,বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এর মাধ্যমে শিক্ষা, তথ্য ও আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, দেশের ৭২.৪ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। একই জরিপে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার এবং এর সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আর তার কার্যকর ব্যবহার এক নয়। স্মার্টফোনের মাধ্যমে আমরা কতটা জ্ঞান অর্জন করছি, আর কতটা সময় ব্যয় করছি উদ্দেশ্যহীন বিনোদনে? একটি শিক্ষার্থী চাইলে স্মার্টফোনে জটিল বিষয় শিখতে পারে, আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র পড়তে পারে কিংবা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। অথচ একই যন্ত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস্ দেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন অনুসরণ করেও সময় কাটানো সম্ভব। প্রযুক্তি এখানে সুযোগ তৈরি করছে; সেই সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্তটি ব্যবহারকারীর। স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের অন্যতম বড় সমস্যা হলো মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা। পড়ার সময় বারবার ফোন দেখা, কাজের মাঝখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে ফেলা কিংবা নতুন বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় থাকা গভীর মনোযোগের চর্চাকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় পড়াশোনার টেবিলে বসেও শেখার প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয় না। তথ্যের সহজলভ্যতা আমাদের জ্ঞানী করে তুলবে এমন নিশ্চয়তা নেই; তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের ক্ষমতাও অর্জন করতে হয়। এর প্রভাব পড়তে পারে ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনেও। রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা, নতুন পোস্ট বা ভিডিও দেখার আকর্ষণে ঘুমের সময় পিছিয়ে দেওয়া এবং ফোন ছাড়া অস্থির বোধ করার অভ্যাস ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। স্লিপ মেডিসিন রিভিউজ সাময়িকীতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের ব্যবহার এবং ঘুমের সমস্যার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সব ধরনের ব্যবহার বা সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। তাই স্মার্টফোন ব্যবহার মানেই ক্ষতি এমন সিদ্ধান্ত যেমন সঠিক নয়, তেমনি এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকে নিরীহ অভ্যাস ভেবে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই ঘরে বসে পরিবারের সদস্যরা যখন নিজ নিজ পর্দায় ব্যস্ত থাকেন, তখন সরাসরি কথোপকথন ও পারস্পরিক অনুভূতি বিনিময়ের সুযোগ কমে যায়। অনলাইনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কেউ কেউ বাস্তব জীবনে একাকিত্ব অনুভব করতে পারেন। অবশ্য দূরে থাকা স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, বিপদের সময়ে সহায়তা চাওয়া কিংবা সমমনা মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের ইতিবাচক ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। সমস্যা প্রযুক্তির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা তখনই, যখন ভার্চুয়াল যোগাযোগ বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় সম্পর্ক ও দায়িত্বকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দেয়। এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধু যন্ত্র চালানো শেখালে চলবে না; কীভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজতে হয়, ভুয়া খবর শনাক্ত করতে হয় এবং প্রযুক্তিকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে লাগাতে হয়, তাও শেখাতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু সচেতন অভ্যাস পরিবর্তন আনতে পারে। পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা, বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করা এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় বই পড়া, ব্যায়াম ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য রাখা জরুরি। প্রযুক্তি যেন আমাদের সময় ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ না করে; বরং আমরাই যেন প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারি। স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাই এর সুবিধা অস্বীকার করা কিংবা একে সব সমস্যার জন্য দায়ী করা কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা। যে প্রযুক্তি মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বাড়াতে পারে, তার অপব্যবহার যেন মনোযোগ, সময় ও সম্পর্কের ক্ষতির কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে
আজকালের খবর
পত্রিকায় প্রকাশিত।
