মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে মানুষের ভবিষ্যৎ

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৬৯ বার

প্রযুক্তি বদলে দিতে পারে মানুষের ভবিষ্যৎ

মানুষের চোখের রং, উচ্চতা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য কিংবা কোনো বংশগত রোগের ঝুঁকির পেছনে রয়েছে জিনের ভূমিকা। জীবদেহের কোষে থাকা ডিএনএতে সঞ্চিত এই জিনগত নির্দেশনাই অনেক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এত দিন জিনের রহস্য উন্মোচন করাই ছিল বিজ্ঞানীদের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু আধুনিক জীবপ্রযুক্তি সেই গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। এখন বিজ্ঞানীরা শুধু জিন পর্যবেক্ষণই করছেন না, বরং ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন আনারও চেষ্টা করছেন। এই বিপ্লবী প্রযুক্তির নাম CRISPR। চিকিৎসা, কৃষি ও জীববিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। CRISPR-এর পূর্ণরূপ Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়ার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি অংশ থেকে উদ্ভূত। বিজ্ঞানীরা এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত ও সম্পাদনার পদ্ধতি তৈরি করেছেন। CRISPR-Cas9 ব্যবস্থায় গাইড আরএনএ কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ অংশকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং Cas9 নামের এনজাইম সেখানে কেটে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগের অনেক জিন-সম্পাদনা পদ্ধতির তুলনায় CRISPR ব্যবহার করা সহজ, দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। এ কারণেই জিনগত গবেষণায় প্রযুক্তিটি ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। CRISPR-এর সবচেয়ে আলোচিত প্রয়োগক্ষেত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান। সিকল সেল ডিজিজ ও বিটা-থ্যালাসেমিয়ার মতো বংশগত রক্তরোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য এটি নতুন আশার দুয়ার খুলেছে। এসব রোগে রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরি বা কাজ করার প্রক্রিয়ায় জিনগত ত্রুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রচলিত চিকিৎসায় অনেক রোগীকে দীর্ঘদিন ওষুধ গ্রহণ কিংবা নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালনের ওপর নির্ভর করতে হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন সিকল সেল ডিজিজের চিকিৎসায় প্রথম CRISPR-ভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতি Casgevy অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট শর্তে ট্রান্সফিউশন-নির্ভর বিটা-থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসাতেও এটি অনুমোদন পায়। এই চিকিৎসায় রোগীর রক্ত তৈরির স্টেম সেল শরীর থেকে সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে জিনগতভাবে সম্পাদনা করা হয়, এরপর সেগুলো আবার রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এর লক্ষ্য হলো ভ্রূণীয় হিমোগ্লোবিন উৎপাদন বাড়িয়ে রোগের জটিলতা কমানো। এটি জিন-সম্পাদনা গবেষণার পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব চিকিৎসায় পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে চিকিৎসাটি জটিল, ব্যয়বহুল এবং সবার জন্য উপযুক্ত নয়। ভবিষ্যতে ক্যানসার, কিছু বংশগত রোগ ও সংক্রামক রোগের চিকিৎসাতেও CRISPR ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এসব প্রয়োগের অনেকগুলো এখনো গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য CRISPR বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, রোগবালাই এবং জমির সীমাবদ্ধতা কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তির সাহায্যে উদ্ভিদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করে রোগপ্রতিরোধী, প্রতিকূল পরিবেশসহনশীল কিংবা উন্নত পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, জিন-সম্পাদনার বিভিন্ন কৌশল নতুন উদ্ভিদজাত, প্রাণিজ ও অণুজীবভিত্তিক বৈশিষ্ট্য উন্নয়নে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের গবেষকেরা ধান, গম, ডাল ও সবজির মতো ফসলে লবণাক্ততা, খরা এবং রোগপ্রতিরোধ নিয়ে গবেষণায় এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট ফসলের উন্নত জাত তৈরি, মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা প্রমাণ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার বিষয়। প্রযুক্তি থাকলেই উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত হবে এমন ধারণাও যথার্থ নয়। CRISPR শুধু চিকিৎসা বা কৃষির প্রযুক্তি নয়; এটি জীববিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণাকেও বদলে দিচ্ছে। কোনো জিনের কাজ কী, নির্দিষ্ট জিনের পরিবর্তনে কোষের আচরণ কীভাবে বদলায় কিংবা রোগের পেছনে কোন জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনা ব্যবহার করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, বিভিন্ন জীবের জিনগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা জিন ও বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ চিকিৎসা উদ্ভাবনে সহায়তা করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও জীবপ্রযুক্তি, উদ্ভিদবিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব ও বায়োইনফরমেটিকসের সমন্বিত গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এ জন্য আধুনিক গবেষণাগার, প্রশিক্ষিত জনবল, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। একই সঙ্গে জিনগত তথ্য বিশ্লেষণে কম্পিউটেশনাল জীববিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার গবেষণার পরিধি বাড়াতে পারে। CRISPR নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতাও প্রয়োজন। জিন সম্পাদনার সময় কাঙ্ক্ষিত স্থানের বাইরে অনিচ্ছাকৃত পরিবর্তন ঘটতে পারে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না-ও যেতে পারে। মানুষের শরীরের সাধারণ কোষে সম্পাদনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বংশগতভাবে সঞ্চারিত হতে পারে এমন ভ্রূণ বা জননকোষের সম্পাদনা এক বিষয় নয়। দ্বিতীয়টির সম্ভাব্য প্রভাব আরও ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানব জিনোম সম্পাদনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে বংশগত পরিবর্তন ঘটানোর মতো প্রয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক কাঠামো ছাড়া এগিয়ে যাওয়া দায়িত্বশীল হবে না। এ ছাড়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা কেবল ধনী মানুষের নাগালে থাকলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে। তাই গবেষণার পাশাপাশি সাশ্রয়ী চিকিৎসা, ন্যায্য প্রবেশাধিকার এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। CRISPR প্রযুক্তি মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তবে সেই পরিবর্তন কতটা কল্যাণকর হবে, তা নির্ভর করবে এর ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। বংশগত রোগের চিকিৎসা, কৃষির উন্নয়ন এবং জীববিজ্ঞানের অজানা রহস্য উন্মোচনে প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাফল্যের সঙ্গে নৈতিক দায়িত্বের সমন্বয় না হলে সেই সম্ভাবনাই ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই CRISPR-কে শুধু ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।