সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সবুজ প্রযুক্তি: উন্নয়ন ও পরিবেশের সমন্বয় 

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ২৭ বার

সবুজ প্রযুক্তি: উন্নয়ন ও পরিবেশের সমন্বয় 

উন্নয়ন মানেই শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, বড় শিল্পকারখানা আর ক্রমবর্ধমান উৎপাদন? উন্নয়নের এই দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে যদি দূষিত হয় বাতাস, সংকুচিত হয় বনভূমি, দূষিত হয় নদী এবং বাড়তে থাকে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি, তবে সেই উন্নয়ন কতটুকু টেকসই? প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সুস্থ জীবন, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবী। এই উপলব্ধি থেকেই আধুনিক বিশ্বে গুরুত্ব পাচ্ছে সবুজ প্রযুক্তি যা উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে। সবুজ প্রযুক্তি বলতে এমন প্রযুক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতিকে বোঝায়, যা প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করে, দূষণ ও বর্জ্য কমায় এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সীমিত রাখে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং পানি পরিশোধন এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি সবুজ অর্থনীতিকে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করে, যা কম কার্বন নিঃসরণ, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নও সবুজ অর্থনীতির লক্ষ্য। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবুজ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা আরও গভীর। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস ২০২৩ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সিসার সংস্পর্শসহ পরিবেশগত সমস্যার কারণে দেশে বছরে ২ লাখ ৭২ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু এবং ৫২০ কোটি অসুস্থতার দিন তৈরি হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে এসব পরিবেশগত সমস্যার অর্থনৈতিক ব্যয় ছিল জিডিপির প্রায় ১৭.৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, পরিবেশ সংরক্ষণ উন্নয়নের পথে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; বরং অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার অপরিহার্য বিনিয়োগ। শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে চিকিৎসা ও পরিবেশগত ক্ষতির ব্যয়ও হ্রাস পেতে পারে।
জ্বালানি খাত সবুজ প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার পরিসংখ্যান 2025 অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৫৮৫ গিগাওয়াট বেড়েছিল; নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির ৯২.৫ শতাংশই এসেছিল নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। বাংলাদেশেও ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন, শিল্পকারখানায় জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং বিদ্যুতের অপচয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ, জমি ও ছাদ ব্যবহারের পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবুজ প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্লাস্টিক, পলিথিন, ইলেকট্রনিক বর্জ্য ও গৃহস্থালি আবর্জনা পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট ও বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং নিরাপদ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে দূষণ কমার পাশাপাশি নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রকল্পে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ এবং বিষাক্ত অবশিষ্টাংশের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। কৃষিতেও সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। পানি সাশ্রয়ী সেচ, সৌরচালিত পাম্প, আবহাওয়ার তথ্যভিত্তিক কৃষি পরামর্শ, মাটির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ুসহিষ্ণু ফসলের ব্যবহার কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি উৎসাহিত করা দরকার। বিশ্বব্যাংকের Framework for Implementing Green Growth in Bangladesh 2023 প্রতিবেদনে পরিবেশগত সুশাসন, জ্বালানি রূপান্তর, সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্যকর ও জলবায়ুসহিষ্ণু সমাজ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সবুজ প্রযুক্তির বিস্তার শুধু যন্ত্রপাতি আমদানির মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন উপযুক্ত নীতি, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম উৎপাদন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণে গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের বাধাও কমবে। সবুজ প্রযুক্তির পথ অবশ্য চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, নীতির দুর্বল বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের সীমিত প্রাপ্যতা অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর যেন রূপান্তরের ব্যয়ের বোঝা না পড়ে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে পরিবেশবান্ধব বলেই গ্রহণ না করে তার উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য নিষ্পত্তির সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সময় এখন পেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এমন উন্নয়নের ওপর নির্ভর করছে, যা মানুষের আয় ও জীবনমান বাড়াবে, অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবে না। সবুজ প্রযুক্তি সেই সমন্বয়ের কার্যকর পথ হতে পারে, যদি তা পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। প্রকৃত উন্নয়ন হবে তখনই, যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল মানুষ পাবে, আর তার মূল্য হিসেবে পরিবেশকে ধ্বংস করতে হবে না।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।