শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

অদৃশ্য রোগের দৃশ্যমান প্রভাব : হেপাটাইটিস ও আমাদের অসচেতনতা

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ পাঠ: ১২ বার

সাবিহা তারান্নুম মিম:   মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার। খাদ্য হজম, পুষ্টি সঞ্চয় এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে লিভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহজনিত একটি রোগ। হেপাটাইটিস ভাইরাস লিভারকে আক্রান্ত করে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে, ফলে শরীরে নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশ্বে প্রাণঘাতী সংক্রামক ভাইরাসের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ভাইরাল হেপাটাইটিস। সাধারণত হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাসের কবলে আক্রান্ত হয়ে থাকে লিভার। এসব ভাইরাসের আক্রমণের ক্ষেত্রে দুটি ধরণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো তাৎক্ষণিক বা অ্যাকিউট এবং দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক লিভার রোগ। ফলে হতে পারে লিভার সিরোসিস, ক্যান্সার কিংবা লিভার ফেইলিউর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যান্সারের মৃত্যুর ক্ষেত্রে তৃতীয় প্রধান কারণ লিভার ক্যান্সার। লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আবার হেপাটাইটিস বি ও সি প্রধান কারণ। আমাদের দেশে প্রায় ৯০ লক্ষ থেকে ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রায় ৪.৪ শতাংশ আক্রান্ত হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে এবং প্রায় ০.৬৬ শতাংশ সংক্রান্ত হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে। অনেক সময় আবার রোগী হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহন করে কিন্তু পরীক্ষায় তা ধরা পড়ে না এ ধরনের হেপাটাইটিসকে বলা হয় অকাল্ট বা লুকায়িত হেপাটাইটিস বি। এক্ষেত্রে রোগীর অজ্ঞাতসারে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার হতে পারে। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বা লিভারের প্রদাহে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ভাইরাসের আক্রমণের পাশাপাশি আরো কিছু কারণ রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মদ্যপান, ডাক্তারের পরামর্শবিহীন ওষুধ গ্রহণ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। তাই হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রয়োজন জনসচেতনতা ও টিকা প্রদান। বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকা দান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস বি এর টিকা সংযুক্ত রয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও সি এর নিরাময়যোগ্য ঔষধ থাকার ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৬ সালে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে সকল সদস্য দেশগুলো হেপাটাইটিস মুক্ত পৃথিবী গড়তে নীতিমালা প্রণয়ন করবে। যার মূল লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে হেপাটাইটিস নির্মূল করা। মূলত এটি ছিল হেপাটাইটিস নিয়ে বিশ্বব্যাপী রোগী কল্যাণ সমিতি ও জনমতে ব্যাপক প্রচারণার ফলাফল। বাংলাদেশের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষরা বেশি হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আবার বিশেষ করে শহরে এর প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। ফলে বিশ্বব্যাপী গৃহীত নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজন পরিকল্পিত কাঠামো গ্রহণ এবং ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম জোরদারকরণ। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ৫ ভাগের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ দেখা যায় এবং শিশুদের মধ্যে ৯৫ ভাগ। ফলে এই দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণ থেকেই লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যান্সার এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ফেইলিউর হয়ে থাকে। ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা সফল করতে হলে গর্ভবতী মায়েদের হেপাটাইটিসমুক্ত রাখা আবশ্যক। কেননা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত মা থেকে সংক্রমিত হয় শিশুরা। ১৯৪৭ সালের ম্যাককালাম প্রস্তাব দিয়েছিলেন পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে হেপাটাইটিস যে ভাইরাসের কারণে ছড়ায় তা হলো হেপাটাইটিস এ। অপরদিকে সূচ, সিরিঞ্জ কিংবা অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে ছড়ায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। এর মধ্যে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। উল্লেখ্য অনেক সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় হেপাটাইটিস বি ধরা পড়ে না। আবার হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ছাড়া লিভারের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ডি জন্মাতে পারে না। এমতাবস্থায় হেপাটাইটিসের প্রতিরোধের লক্ষ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা আবশ্যক। পাশাপাশি নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, জীবাণুমুক্ত পানি ও খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস এবং নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণও উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও গর্ভবতী নারীদের জন্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও অন্যান্য রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে বা ক্লিনিকে একই সূচ ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ। যাবতীয় চিকিৎসার জন্য সকল সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করা। নবজাতকদের ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন প্রদান করার ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। আমাদের দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস করে। তাদের ক্ষেত্রে কুসংস্কার ও বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করে তোলার মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলে হেপাটাইটিসের প্রাদুর্ভাব কমানো যেতে পারে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি প্রয়োজন বেসরকারি সংস্থা ও জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকারিভাবে জাতীয় ভাইরাস হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নীতিমালা গ্রহণ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন অপরিহার্য। হেপাটাইটিস নির্মূলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিরোধের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ। নিয়ন্ত্রণের ফলে সম্ভব হবে হেপাটাইটিস দূরীকরণ। নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দূষিত পানি ও খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে সতর্কতা অবলম্বন। এছাড়াও রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে সুস্থ মানুষের রোগমুক্ত ও নিরাপদ রক্ত প্রদান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক আলোচিত ফ্যাটি লিভার ডিজিজ থেকে হেপাটাইটিসের সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সচেতনতা ও সুস্থ জীবন যাপন। অর্থাৎ পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণ, কায়িক শ্রম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা জরুরি। কোন ব্যক্তির হেপাটাইটিস রোগের লক্ষণ একাধিক প্রকাশ পেলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে রোগ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক। স্বাস্থ্য নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকলে মানবদেহে সুস্থতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতার প্রসার বৃদ্ধির লক্ষ্যে ক্যাম্পাসভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমও সহায়ক। পরিশেষে হেপাটাইটিস মোকাবেলাতে প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য ও সচেতনতা। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সমাজে সৃষ্টি হবে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বর্তমানে উন্নত স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রসার অপরিহার্য। যা সংক্রমণ নির্মূল করে গড়ে তুলতে পারে হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ।

সাবিহা তারান্নুম মিম

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

ইডেন মহিলা কলেজ

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!