রবিবার, ৩ মে ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আয়নায় উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি: গণতন্ত্রের লিটমাস টেস্টে বাস্তব চিত্র

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১৫ বার

সাবিহা তারান্নুম মিম :  সন্তানের ভারাক্রান্ত হৃদয়ের প্রথম সংক্রমণের শিকার যেমন মায়ের মন হয়ে থাকে। তেমনি জনগণের অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা দেশমাতৃকার অন্তরে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। একটি দেশের অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে গণতন্ত্রের দুর্বলতা।রাজনৈতিক অগ্রগতিতে সংকট সৃষ্টি করে না বরং প্রভাব সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক, সামাজিক কাঠামোতে। গণতন্ত্রের সঠিকভাবে কার্যকর না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। দেশ পরিচালনায় শাসনব্যবস্থায় গণতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। প্রাচীন যুগে খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে এথেন্সের নগর রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের যাত্রা সূচনা হয়। পরবর্তীতে মধ্যযুগে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের চর্চা বেশি হয়, অনুশীলন কমে গণতন্ত্রের। ধারাবাহিকভাবে গণতন্ত্রের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ১৭৭৬ সালের আমেরিকান বিপ্লব, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব। মূলত গণতন্ত্র ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় উনিশ শতকে।

এরপর প্রাচীন যুগের নারীসহ প্রাপ্তবয়স্কদের গণতন্ত্রে অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুগে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণ ১৯৪৭ সাল থেকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় বাজি রেখে আসছে জীবন। বিনিময়ে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়ে যায় বারংবার। এরই ধারাবাহিকতায় পরাধীনতার ইতিহাস কাটিয়ে ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্রকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর থেকে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন প্রয়োজন। কেননা মূল্যায়ন দেশের গণতন্ত্রের সফলতা ও ব্যর্থতার মানদণ্ড প্রকাশক।

প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রধান সূচক জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ মূল্যায়ন। তদুপরি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু মৌলিক মানদণ্ডের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে। প্রাথমিকভাবে, শাসন ব্যবস্থায় আইনের নিরপেক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে জবাবদিহিমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসনের অবস্থান উল্লেখযোগ্য সূচক। পাশাপাশি বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার মূল্যায়নও অপরিহার্য। তাদের গঠনমূলক সমালোচনাই পারে সংসদের উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সফল সমাধান আনতে। সরকারি এবং বিরোধী দলের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে পরস্পরের সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতা রাষ্ট্রকে নিয়ে যেতে পারে উন্নয়নের চূড়ায়। দলীয় লক্ষ্যমাত্রার ঊর্ধ্বে মূল উদ্দেশ্য হবে ক্ষমতার গোলকে আবিষ্ট না হয়ে জনগণের কল্যাণের ভারসাম্য বজায়। সবশেষে সামাজিক উন্নয়নের মানদন্ডের ক্ষেত্রে যাচাই করতে হবে সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের গতি। সমাজের তরুণ শক্তির ও নারী শক্তির সার্বিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ টিকিয়ে রাখতে পারে সমাজের উন্নয়নের ধারা। এই নিমিত্তে জনগণের অধিকারের ধারার উত্থান নিশ্চিত করে জনগণের ক্ষমতায়ন। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা বারবার রুখে দিয়েছে আধিপত্যবাদের পথ।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী নির্বাচন শুধু গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় তাদের দায়িত্বশীল আচরণই জনগণের বাসনা। আর গণতন্ত্রের মূল্যবোধের সার্বিক অনুশীলন রক্ষা করে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের রক্ষাকবচ। ২০২৬ এর জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী সময়কালে আইনের পরিপূর্ণ শাসন এবং নাগরিকদের স্বচ্ছ অধিকার নিশ্চিতকরণ জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম হবে গণতন্ত্রের আলো। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে সুপ্ত অভিলাষ ছিল ঠিক কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে জনগণের মনে তা প্রশ্নবিদ্ধ। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জনগণ রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে। জাগ্রত হয়ে উঠেছে তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে।

তরুণ সমাজের বেড়েছে রাজনীতির প্রতি অনুরাগ। ফলাফল তারা সরকারি সকল পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হলো সংসদের প্রতিটি অধিবেশনের তর্ক-বিতর্কের চিত্র উঠে আসছে দৈনন্দিন ধারাবাহিক খবরের প্রবাহে। সেক্ষেত্রে সরকারের প্রতিটি বক্তব্য সংবেদনশীল হয়ে থাকে। তাই তাদের গণতন্ত্রের প্রতি সহনশীল হতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে হতে হবে সংকল্পবদ্ধ।

২০২৪ সালে লন্ডনভিত্তিক EIU প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবনতি উঠে এসেছিল। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি বিবেচনায় গণতন্ত্রের পতনের ভয়াবহ বার্তা উঠে আসছে। ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গণতন্ত্রের মান যাচাইয়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান Varieties of Democracy Institute কর্তৃক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অবস্থান। V-Dem বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। তাদের নির্ধারিত সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উদার গণতন্ত্রের মান এবং নাগরিক স্বাধীনতা ও আইনের দুর্বল শাসনের নির্ধারক Liberal Democracy Index-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩। আবার বিচার বিভাগ, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতার পরিমাপের সূচক Liberal Component Index এ অবস্থান ১৩০।

অন্যদিকে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা কম ও বৈষম্যের মানদণ্ডে Egalitarian Component Index এ দেশের অবস্থান ১৪০। এছাড়াও বাংলাদেশের নিম্নগামী অবস্থান গুণগত মানের দুর্বলতার দরুন প্রতিফলিত হয়েছে আরো কিছু সূচকের পরিমাপে। যেহুতু বিশ্বব্যাপী সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে গণতন্ত্রের যাত্রা। একমাত্র সকলের সম্মিলিত সম্মানজনক পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান নজির সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বিলীন হয়ে যাবে কর্তৃত্ববাদের উত্থানের হাতিয়ার। সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সে লক্ষ্যে গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করতে সকল সূচকের সার্বিক কার্যকারিতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরী।

যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংঘাতে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। অগ্রাধিকার দিতে হবে সকল স্তরের সমস্যার সমাধানের প্রক্রিয়াকে। তৃণমূল পর্যায় থেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে একে অপরের প্রতি সম্মান ও সহনশীল আচরণের। এছাড়াও সকল বিভাগের স্বচ্ছ ও কৌশলী জবাবদিহিমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়নেই সম্ভব দুর্বলতা কাটিয়ে গণতন্ত্রের স্বপ্নপূরণ। বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণের পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক ও সহনশীলতার গণতন্ত্র তৈরি দেশের জনগণের উন্নয়নের অগ্রগতি রক্ষা করবে। ক্রমেই জনগণের উন্নতি দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সহায়ক ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রের আয়নায় প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে দেশমাতৃকার উন্নয়নের।

সাবিহা তারান্নুম মিম

ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!