বইয়ের কাছে ফিরুক নতুন প্রজন্ম।
মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ পাঠ: ৬ বার
বইয়ের কাছে ফিরুক নতুন প্রজন্ম
একটি জাতি কতটা এগিয়ে যাবে, তা নির্ধারিত হয় সেই জাতির মানুষ কতটা ভাবতে পারে তার ওপর। আর তা ভাবতে শেখায় বই। অথচ আজ সেই বই ধুলো জমে থাকে, আর স্ক্রিনের নীল আলোয় ডুবে আছে একটি প্রজন্ম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “বই হলো অতীত আর বর্তমানের মধ্যে সেতু।” সেই সেতু আজ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে— আর এই দুর্বলতা কেবল একটি অভ্যাসের ক্ষতি নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের ক্ষতি। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শর্ট ভিডিয়ো আর অনলাইন বিনোদনের এই যুগে তরুণদের একটি বড়ো অংশ বই থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় কাটলেও একটি বই নিয়ে নিরিবিলি বসার ধৈর্য অনেকের মধ্যেই কমে যাচ্ছে। এর পরিণতি শুধু পাঠাভ্যাসের অবক্ষয়ে নয়, এর প্রভাব পড়ছে চিন্তার গভীরতায়, বিশ্লেষণী ক্ষমতায় এবং মানবিক সংবেদনশীলতায়। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গভীর পাঠের অভ্যাস উদ্বেগজনকভাবে কমে আসছে। বাংলাদেশেও চিত্রটি আশাব্যঞ্জক নয়— গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে সরকারি পাবলিক লাইব্রেরির সংখ্যা মাত্র ৭২টি, যা ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল। তথ্যের প্রাচুর্য বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞানের গভীরতা সেই গতিতে বাড়ছে না।
প্রশ্ন উঠতে পারে— ডিজিটাল যুগে বইয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে কি? উত্তর হলো, আগের চেয়ে অনেক বেশি আছে। ইতিহাসের বই আমাদের অতীতের ভুল ও সাফল্য থেকে শিক্ষা দেয়, সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে মানবিক করে তোলে, বিজ্ঞান আমাদের যুক্তিবাদী হতে শেখায়, আর দর্শন জীবনের অর্থ খুঁজতে সাহায্য করে। গবেষণা বলছে, নিয়মিত বই পড়া মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ করে এবং মানসিক চাপ কমায়। শুধু তাই নয়, বই পড়ার অভ্যাস সহমর্মিতা ও সামাজিক সংবেদনশীলতাও বৃদ্ধি করে— কারণ একটি উপন্যাস বা গল্পের মধ্য দিয়ে পাঠক অন্যের জীবন ও অনুভূতি অনুভব করতে শেখেন। এ ছাড়া বই পড়া ভাষাজ্ঞান, শব্দভান্ডার ও লেখার দক্ষতা বিকাশেও অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। একজন নিয়মিত পাঠক শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করে না, সে একজন সচেতন, সহনশীল ও সৃজনশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে ওঠে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের হাতেই থাকবে গবেষণাগার, আদালত, হাসপাতাল, প্রশাসন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব। তাই তাদের চিন্তার পরিধি যত বিস্তৃত হবে, দেশও তত এগিয়ে যাবে। কিন্তু যদি তারা কেবল দ্রুতগতির তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, গভীর পাঠের অভ্যাস হারিয়ে ফেলে, তবে ভবিষ্যতের নেতৃত্বও দুর্বল হয়ে পড়বে। এখানে একটি আশার কথাও আছে— ই-বুক ও অডিওবুকের মতো ডিজিটাল মাধ্যম এখন পাঠের নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে। প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে তা বইয়ের বিকল্প নয়, বরং বইয়ের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার। ছোটোবেলায় শিশুদের গল্পের বই উপহার দেওয়া, ঘুমানোর আগে বই পড়ে শোনানো কিংবা বাড়িতে একটি ছোট্ট বইয়ের তাক তৈরি করা— এসব সরল অভ্যাসই শিশুমনে পাঠের প্রতি আজীবনের ভালোবাসা জন্ম দেয়। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাহিত্যচর্চা, পাঠচক্র, গ্রন্থাগার ব্যবহার এবং বই আলোচনার আয়োজন বাড়ানো উচিত। একটি প্রাণবন্ত গ্রন্থাগার অনেক সময় একটি প্রজন্মের চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারে।
সমাজ ও রাষ্ট্রকেও এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বইমেলা, সাহিত্য উৎসব, পাঠ প্রতিযোগিতা এবং লেখক-পাঠক আড্ডার মতো আয়োজন তরুণদের বইমুখী করতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক পাঠাগার সময় নির্ধারণ, বই ক্রয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তুকি প্রদান, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পাবলিক লাইব্রেরি বিস্তার এবং জাতীয় পাঠাভ্যাস উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন— এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা এখন অপরিহার্য। পাঠকসমাজ গড়ে তোলা কেবল ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রেরও কর্তব্য।
ইতিহাস সাক্ষী, যে-সব জাতি জ্ঞানচর্চাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, তারাই সভ্যতার শীর্ষে পৌঁছেছে। বই পড়া মানে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, বই পড়া মানে নিজেকে জানা, পৃথিবীকে বোঝা এবং একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু করা। নতুন প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা তাই কোনো আবেগের কথা নয়— এটি সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। বইয়ের পাতায় যে আলো জ্বলে, সেই আলোই একটি প্রজন্মকে পথ দেখায় এবং একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
লেখক : –
সুমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
ই-মেইল:- sumonaakter472192@gmail.com
Sent from Outlook for Android
Sent from Outlook for Androidhttps://epaper.banglabazarpatrika.net/edition/696/epaper-june-12-2026/page/4
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।