শিক্ষাঙ্গনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: আর বিলম্ব নয়।
মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ১৯ বার
শিক্ষাঙ্গনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: আর বিলম্ব নয়
সুমনা আক্তার
একজন শিক্ষার্থী যথারীতি ক্লাসে আসে, বন্ধুদের সঙ্গে হাসে-খেলে, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলও করে। বাইরে থেকে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু তার মনের ভেতর হয়তো চলছে অবিরাম যুদ্ধ। এই যুদ্ধ উদ্বেগ, হতাশা, একাকীত্ব আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার সঙ্গে। সেই যুদ্ধের খবর আমরা অনেক সময় জানতে পারি তখনই, যখন আর কিছুই করার থাকে না। এটি কোনো একজন শিক্ষার্থীর গল্প নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এক নীরব বাস্তবতা। আজকের শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের চাপ নয়, প্রতিযোগিতা, পারিবারিক অতিপ্রত্যাশা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মতো অসংখ্য মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে। অথচ তাদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টি এখনো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ৮ জন মানুষের মধ্যে ১ জন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, আর এর সূএপাত ঘটে কৈশোর বা তরুণ বয়সেই। ইউনিসেফও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা তরুণদের সুস্থ বিকাশের অন্যতম বড় বাধা। এসব তথ্য স্পষ্ট করে দেয়- মানসিক স্বাস্থ্য আর নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি শিক্ষা, উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও উদ্বেগজনক। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী নীরবে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং একাকীত্বের সঙ্গে লড়াই করছেন। কিন্তু সামাজিক সংকোচ, কুসংস্কার এবং সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাহায্য চাইতে পারেন না – কারণ অনেকেই মনে করেন, মানসিক সমস্যার কথা বললে মানুষ তাকে দুর্বল বা অযোগ্য ভাববে। ফলে সমস্যা ধীরে ধীরে আরও জটিল হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের এই চাপের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। ভালো ফল করার তীব্র প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের তুলনা, সবকিছু মিলিয়ে তারা ভেঙে পড়ে। অনেকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার মতো একজন বিশ্বস্ত মানুষও খুঁজে পান না। দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী বা পেশাদার কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা নেই। কোথাও থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়, অথবা শিক্ষার্থীরা সে সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়েই সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত থেকে যায়। অথচ সময়মতো একটু সহানুভূতির পরামর্শ-ই অনেক জটিল পরিস্থিতি সহজ সমাধান এনে দিতে পারত। এই সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা জরুরি, যেখানে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দিয়ে গোপনীয়, সহজলভ্য ও বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বছরে একাধিকবার কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন প্রয়োজন। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, দীর্ঘদিন মনমরা ভাব , পড়াশোনায় আগ্রহ হারানো বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার লক্ষণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারলে অনেক বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহানুভূতিশীল ও বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলাও সমান জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। মানসিক সমস্যা লুকিয়ে রাখার বিষয় নয়, বরং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়াই সাহস আর সচেতনতার পরিচয়।
এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের জোরালো দাবি – প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন, প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ, নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম এবং একটি কার্যকর জাতীয় নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি সুস্থ, মানসিকভাবে সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
লেখক : –
সুমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
ই-মেইল : sumonaakter472192@gmail.com
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।