তত্ত্বের বন্যায় সত্যের সংকট : ভুয়া খবরের যুগে সচেতনতার প্রয়োজন।
মোছা সোমনা আক্তার , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ১৭ বার
তথ্যের বন্যায় সত্যের সংকট: ভুয়া খবরের যুগে সচেতনতার প্রয়োজন।
সুমনা আক্তার
আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনে এইমাত্র একটি খবর এসেছে -চমকপ্রদ, উত্তেজনাকর, শেয়ার করার মতো। আপনি কি সেটির উৎস যাচাই করবেন, নাকি শুধু লাইক আর শেয়ার বাটনেই ভরসা রাখবেন? এই সাধারণ প্রশ্নটিই আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগের সবচেয়ে বড় সংকট তুলে ধরে।
বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিশ্বের এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষের জ্ঞানার্জন, যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে আরেকটি বড় সংকট-তথ্যের বন্যায় সত্যকে খুঁজে পাওয়ার সংকট। প্রতিদিন অসংখ্য সত্য, অর্ধসত্য ও মিথ্যা তথ্য একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে কোনটি বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি বিভ্রান্তিকর তা নির্ণয় করা সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
ভুয়া খবর নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে এর বিস্তার আজ নজিরবিহীন। অতীতে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত, এখন একটি পোস্ট, ভিডিও বা ছবি মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেকে তথ্যের উৎস যাচাই না করেই তা শেয়ার করেন, ফলে একটি ভুল তথ্যও সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি কিংবা সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, আর্থিক লাভ কিংবা বেশি দর্শক পাওয়ার আশায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া খবর তৈরি ও প্রচার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটক এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমন বিষয়বস্তু বেশি ছড়ায়, যা মানুষের আবেগ, কৌতূহল বা বিতর্ক সৃষ্টি করে। ফলে যাচাইকৃত তথ্যের চেয়ে চমকপ্রদ ভুয়া খবর অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে মানুষ ধীরে ধীরে এমন একটি তথ্যপরিবেশে বসবাস করতে শুরু করে, যেখানে সত্যের চেয়ে উত্তেজনাই বেশি গুরুত্ব পায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা সম্ভব, যা বাস্তব বলে মনে হয়। কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলেছেন বা কাজ করেছেন বলে দেখানো যায়, যা তিনি কখনোই করেননি। ফলে ভবিষ্যতে শুধু লেখা নয়, ছবি ও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ভুয়া খবরের প্রভাব ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব ক্ষেত্রেই গভীর। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ভুল তথ্য মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, অর্থনৈতিক গুজব বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, আর রাজনৈতিক বিভ্রান্তি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে। সাম্প্রদায়িক গুজবের কারণে সংঘর্ষ, সামাজিক অস্থিরতা এবং নিরীহ মানুষের ক্ষতির ঘটনাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটেছে। ২০১৮ সালে শ্রীলঙ্কায় ফেসবুকে ছড়ানো সাম্প্রদায়িক গুজবের জেরে সংঘটিত দাঙ্গা এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, যা দেখিয়ে দেয় ভুয়া তথ্য কীভাবে বাস্তব জীবনে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তাই এটি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক ও নাগরিক সচেতনতারও একটি বড় প্রশ্ন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রথম ধাপ হলো তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। কোনো তথ্য দেখেই তা বিশ্বাস বা শেয়ার না করে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম, সরকারি সূত্র কিংবা স্বীকৃত ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা উচিত। উৎসের নাম, প্রকাশের তারিখ এবং প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ আছে কি না- এই তিনটি বিষয় যাচাই করলেই অনেক ভুয়া তথ্য সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ে পাঠ্যক্রম চালু করা জরুরি, যাতে নতুন প্রজন্ম শুরু থেকেই তথ্য বিশ্লেষণ ও যাচাই করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে। গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সরকারকেও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্বচ্ছ রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সংবাদমাধ্যমগুলোকে দ্রুত প্রকাশের প্রতিযোগিতার বদলে যাচাইকৃত সাংবাদিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারকে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভুয়া তথ্য দমনের নামে ভিন্নমত দমন যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তথ্যের এই অবাধ প্রবাহের যুগে সত্যকে রক্ষা করা শুধু সাংবাদিক বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়,এটি প্রতিটি নাগরিকেরও নৈতিক দায়িত্ব। একটি অসত্য তথ্য সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, আবার একটি যাচাইকৃত সত্য মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। প্রশ্ন হলো-পরবর্তী যে তথ্যটি আপনার হাতে আসবে, সেটি শেয়ার করার আগে আপনি কি একবার থামবেন?
লেখক :-
সুমনা আক্তার
শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ।
ই-মেইল :- sumonaakter472192@gmail.com
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।