বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ঋতুর অসুখে কৃষকের ঋণ

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ১৪ বার

‎বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি। ঋতুচক্রের নিয়ম মেনে কৃষকরা জমিতে বীজ বুনে থাকে। কৃষি বরাবরই প্রকৃতিনির্ভর। বর্তমানে বাংলাদেশের অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে দেখা দেয় দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা বা তীব্র তাপদাহ। প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কৃষিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রভাবে ফলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তায় অনিশ্চয়তা। এছাড়াও উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা নদী ভাঙ্গনে কমে যাচ্ছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ। ফলে কৃষিখাতের উৎপাদন ব্যবস্থা পড়েছে ঝুঁকির মুখে। ঠিক সময়ে ঋতুর আবির্ভাব না হলে চাষাবাদের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেখা দেয় পানির অভাব কিংবা ফলনের সময়ে অতিবৃষ্টি। প্রাকৃতিক এই ভারসাম্যহীনতার প্রভাব পড়ে কৃষকদের জীবনে। ঋতুর নিয়ম ভঙ্গ হওয়ায় ফলনের অসামঞ্জস্যতার জন্য কমে যায় ফসলের পরিমাণ। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি হয়। ফলে যেকোনো সময় হঠাৎ করে মেঘ জমে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রাও অন্যতম একটি নিয়ামক। যখন সাগরের পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি করে, তখন ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষি জমি আবাসন, শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের গাছপালার পরিমাণ অতিরিক্ত কম হওয়ায় তাপমাত্রা বেশি থাকে। ফলে গরম বাতাস উপরে উঠে স্থানীয়ভাবে ঝড়-বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি এপ্রিলে টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে গেছে। সরকারি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হলেও বাস্তবতার চিত্র আরো করুণ। দেখা যায়, বীজ রোপণের সময় যদি টানা বৃষ্টি হয় তখন পচে যায় চারা। এছাড়াও টমেটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদি সবজিতে পানি জমলেই গোড়া পচে যায়। ধান বা ফসল ভিজে যায় যখন সেটাও অনেকাংশে শুকানো যায় না। ফলে চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে এক রাতের অতিবৃষ্টিতে শেষ হয়ে যায় লাখ টাকার চাষ। এছাড়াও আবহাওয়ার তারতম্যে ঠান্ডা গরমের প্রভাবে দেখা দেয় পোকামাকড়ের সংক্রমণ। কৃষকদের করুণ দশার এটি অন্যতম একটি আতঙ্ক। গরম আর ভেজা আবহাওয়ার দরুন দেখা দেয় বিভিন্ন পোকামাকড় ও ছত্রাকের সংক্রমণ। ঠান্ডা গরমের তারতম্যে ধানে ব্লাস্ট ও সবজিতে ভাইরাসের আক্রমণ দেখা দেয়। এছাড়াও ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করেও কৃষক অনেক সময় উৎপাদন খরচ তুলতে পারে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষকদের ন্যায্য মূল্যের সংকট দেখা দেয়। ফলে ফসল ফলাতে কৃষকরা মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়ে থাকে। এভাবেই কৃষকরা পড়ে যায় আর্থিক সংকটে। মহাজনের পূর্ববর্তী ঋণের সাথে যুক্ত হয় নতুন ঋণ, ফলে বাড়তে থাকে কৃষকের ঋণের বোঝা। বৈরী ঋতুর প্রভাবে শেষ হয়ে যাওয়া ফসলের পুঁজি এবং অতিরিক্ত খরচ বাড়ার ফলে ঋণ থেকেই যায় কৃষকদের জীবনে। কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার রক্ষক। তাই রাষ্ট্রের উন্নয়নে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে স্থিতিশীল হবে অর্থনীতির চাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষকদের জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতের সম্প্রসারণে নানা সেবা নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালে, কৃষক কার্ডের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সারাদেশে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষকদের সকল তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত কৃষকদের জন্য ঋণ, ভর্তুকি ও সরকারি বিভিন্ন সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনায় প্রয়োজন স্বচ্ছতা। ঋতুর এই অস্বাভাবিকতা মাথায় রেখে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কৃষি খাতের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং অবশ্যই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা খাতের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গবেষণা এবং অভিযোজন প্রকল্পে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগেও বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জলবায়ু পরিবর্তন। যা কৃষি স্বাভাবিক চক্রকে ভেঙে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষকদের জন্য সঠিক আবহাওয়া তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের ফসল বাঁচানোর লক্ষ্যে পূর্বাভাসের ব্যবস্থা করা গেলে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কেননা কৃষকদের অভিযোজনের সুযোগ কৃষির ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম করে তুলবে। পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কৃষকদের জন্য জলবায়ু-সহনশীল বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষকরা যেন ঋতুকে কেন্দ্র করে অসহায় হয়ে না পড়ে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি হাতিয়ার হলো ফসল বীমা ও সমবায়ভিত্তিক ঋণ। হাওরে যে অসময়ে বৃষ্টি আর উজানের ঢলে যে ব্যাপক ক্ষতি হয় তার কবলে ফলন কমলেও যেন দিশেহারা না হয়ে পড়ে কৃষকরা। তাই প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কৃষি বীমা কর্পোরেশন, ব্যাংক কিংবা এনজিওতে ফসল বীমার সুবিধা কার্যকর। একই সঙ্গে কৃষি পণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার সংস্কার আনতে হবে। ন্যায্য মূল্য সংরক্ষণ, সহজ বিপণন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনলে কৃষকরা তাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে। কৃষকদের ক্ষতির আশঙ্কা দূর করতে পারলে বাংলাদেশের খাদ্যের নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হবে। কৃষকরা আমাদের দেশের অর্থনীতির নির্মাতা। তাই তাদের প্রকৃত উন্নয়ন জাতির ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। একটি উন্নত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে কৃষকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যা আগামীদিনের বাংলাদেশকে রপ্তানী নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ,সমৃদ্ধ ও টেকসই করবে।

‎সাবিহা তারান্নুম মিম

‎শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

‎ইডেন মহিলা কলেজ

লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!