মিসওয়াক : সুন্নাহ, সুস্বাস্থ্য ও সচেতন জীবনের অনন্য শিক্ষা
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা দাঁত ব্রাশ করি। এটিকে আমরা স্বাস্থ্যবিধির অংশ বলেই জানি। কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য মুখ পরিষ্কার রাখা শুধু স্বাস্থ্যচর্চা নয়, এটি ইবাদতেরও প্রস্তুতি। ইসলাম চৌদ্দশত বছর আগেই যে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দিয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ তার নানা দিক নতুন করে আবিষ্কার করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে যে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মহান সুন্নাহকে, আর তা হলো মিসওয়াক।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
“মিসওয়াক মুখের পবিত্রতা এবং রবের সন্তুষ্টির মাধ্যম।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৮৯)
এই সংক্ষিপ্ত হাদিসেই মিসওয়াকের প্রকৃত পরিচয় ফুটে উঠেছে। একদিকে এটি মুখ পরিষ্কার রাখে, অন্যদিকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। অর্থাৎ একই আমলে দুনিয়াবি উপকারিতা ও আখিরাতের সওয়াব একত্রিত হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন। দাঁতের যত্নে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত টুথব্রাশ, বিভিন্ন ধরনের টুথপেস্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO)’-এর এক গবেষণা উদ্বেগ জনক তথ্য সামনে এনেছে। গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৭৬.৫ শতাংশ নমুনায় বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০ টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা এবং ক্যানসারের মতো ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগ জনক। তবে এটিকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক নয়, বরং শিক্ষা গ্রহণই হওয়া উচিত। কারণ ইসলাম কখনো অযৌক্তিক ভয় সৃষ্টি করে না বরং নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার দিকনির্দেশনা দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মিসওয়াকের গুরুত্ব আজ আরও নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে।
প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু মিসওয়াকের ফজিলত বর্ণনা করেননি, বরং নিজের জীবনে এর ধারাবাহিক অনুশীলনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ঘরে প্রবেশের সময় তিনি মিসওয়াক করতেন। ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই মিসওয়াক করতেন। অজুর আগে মিসওয়াক করতেন। এমনকি জীবনের শেষ মুহূর্তেও তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল মিসওয়াক করা। হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত সেই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য আজও এক গভীর শিক্ষা।
তিনি আরও ইরশাদ করেছেন,
“আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে আমি প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের জন্য মিসওয়াক অপরিহার্য করে দিতাম।” (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস প্রমাণ করে, ইসলামে মিসওয়াক কোনো আনুষ্ঠানিক বা গৌণ বিষয় নয় বরং পরিচ্ছন্নতা, ইবাদতের প্রস্তুতি এবং সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
মিসওয়াকের আরেকটি তাৎপর্য হলো, এটি প্রাকৃতিক। এতে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক নেই, নেই প্লাস্টিকের ব্যবহার। পরিবেশবান্ধব এই উপকরণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণায়ও বিভিন্ন ধরনের মিসওয়াক কাঠে প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান, দাঁত পরিষ্কারে সহায়ক খনিজ এবং মুখের দুর্গন্ধ কমানোর উপাদানের উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট দাবি গবেষণার মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত, তবুও এতটুকু স্পষ্ট যে মিসওয়াক শুধু একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়, বরং স্বাস্থ্যসম্মত একটি স্বাভাবিক অভ্যাসও।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির খবর মানেই সব ধরনের টুথপেস্ট ব্যবহার হারাম বা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য, এমন সিদ্ধান্ত ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং সচেতনভাবে নিরাপদ পণ্য নির্বাচন করা এবং একই সঙ্গে সুন্নাহর উপর আমল করা একজন মুমিনের জন্য অধিকতর উত্তম পথ। কেউ চাইলে দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন, আবার অজু, নামাজ, ঘুম থেকে ওঠা কিংবা অন্যান্য সুন্নাহসম্মত সময়ে মিসওয়াকের আমলও জীবন্ত রাখতে পারেন। এতে স্বাস্থ্য ও সুন্নাহ উভয়ই অর্জিত হবে।
আমাদের বাস্তবতা হলো, অনেক মুসলমানের ঘরে দামি টুথব্রাশ আছে, কিন্তু একটি মিসওয়াকও নেই। অথচ সাহাবায়ে কেরাম এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, তাঁরা কানের পাশে মিসওয়াক গুঁজে রাখতেন, যেন কোনো অবস্থাতেই এ সুন্নাহ ছুটে না যায়। তাঁদের কাছে এটি ছিল প্রিয় নবীর ভালোবাসার নিদর্শন।
প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি সুন্নাহ মানবকল্যাণের জন্য। কোনোটি আত্মার পরিচ্ছন্নতা শেখায়, কোনোটি শরীরের, কোনোটি সমাজের, আবার কোনোটি পরিবেশের। মিসওয়াক সেই সুন্নাহগুলোর একটি, যেখানে ইবাদত, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাকৃতিক জীবনযাপন এক সুতোয় গাঁথা।
তাই আমরা মিসওয়াককে রাসূল সা. এর জীবন্ত সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করি। মুখের পবিত্রতার সঙ্গে অর্জন করি রবের সন্তুষ্টি। সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করি আমাদের প্রতিদিনের জীবন।
লেখক,
হাবিব আল মিসবাহ
• শিক্ষার্থী : আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
• উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
• নিউজ এডিটর, কুষ্টিয়া সার্কেল (আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল)
• ইবি ক্যাম্পাস প্রতিনিধি, প্রেস পয়েন্ট (অনলাইন নিউজ পোর্টাল)
মোবাইল : ০১৬১১-৫৬৩৮১৯
মেইল : hmh42242@gmail.com
