বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি : সাধারণ মানুষের ওপর আরেক দফা চাপ
সন্ধ্যা নামলেই একসময় গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে কুপিবাতি কিংবা হারিকেন জ্বলে উঠত। বিদ্যুতের আলো তখন ছিল অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আজ শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষা থেকে চিকিৎসা, কৃষি থেকে শিল্প সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ এখন আর কেবল একটি সেবা নয় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সেই অপরিহার্য সেবাটিই যখন বারবার মূল্যবৃদ্ধির মুখোমুখি হয়, তখন প্রশ্ন জাগে এর বোঝা শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে?
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। জুন মাসের বিলিং থেকেই এই নতুন হার কার্যকর হবে। ফলে সাধারণ গ্রাহকের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় পৌঁছেছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। নিঃসন্দেহে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব খরচ রয়েছে, রাষ্ট্রেরও আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই সবচেয়ে বেশি পড়ে।
দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে জীবনযাপন করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি তাদের মাসিক ব্যয়ের খাতকে আরও ভারী করবে। হয়ত অনেকের কাছে মাসে অতিরিক্ত কয়েকশ টাকা তেমন বড়ো অঙ্ক নয়, কিন্তু সীমিত আয়ের একটি পরিবারের জন্য সেটিই হতে পারে মাসের বাজার খরচের একটি অংশ কিংবা সন্তানের পড়াশোনার প্রয়োজনীয় ব্যয়।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু গৃহস্থালির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্প ও ব্যাবসায়িক খাতও এর প্রত্যক্ষ প্রভাবের মুখোমুখি হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। ফলে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব বাজারে পণ্যের মূল্যের ওপর পড়বে। অর্থাৎ বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। বারবার মূল্যবৃদ্ধি কি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করতে পারবে? বিদ্যুৎ খাতের চ্যালেঞ্জ কেবল উৎপাদন ব্যয় নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, সিস্টেম লস, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রশ্ন। যদি এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়ত সাময়িকভাবে সরকারের খাতা-কলমের ঘাটতি কমাবে কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান হবেনা।
বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও অন্যান্য বিকল্প শক্তির উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ খাতে সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। জনগণ জানতে চায়, উৎপাদন ব্যয় কেন বাড়ছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাতটির আর্থিক অবস্থার কতটা উন্নতি হবে। কারণ জনগণের অর্থেই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, আর সেই জনগণের কাছে জবাবদিহিতাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই কেবল মূল্য সমন্বয়ের মধ্যেই সমাধান খোঁজা যাবে না বরং বিদ্যুৎ খাতকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কয়েক বছর পর আবারও একই যুক্তিতে নতুন মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসবে, আর তার বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
বিদ্যুতের আলো আমাদের উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু সেই আলোর মূল্য যদি মানুষের নাগালের বাইরে যেতে শুরু করে, তবে উন্নয়নের সুফলও প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
হাবিব আল মিসবাহ
শিক্ষার্থী : আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
মোবাইল : ০১৬১১-৫৬৩৮১৯
মেইল : hmh42242@gmail.com
