বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সীমান্ত প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন

Author

হাবিব আল মিসবাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

 

বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন। অথচ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতার লড়াই, ব্যাংক দখল ও প্রতিদখল, দলীয় অবস্থান শক্ত করার হিসাব-নিকাশ। সীমান্তের দিকে যেন কারও নজর নেই।

 

বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আছে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ দেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে বহন করছে। কিন্তু সামনে আরও বড় সংকট অপেক্ষা করছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে।

 

রোহিঙ্গা সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। একটি মানবিক বিপর্যয় কেবল সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চলের সমস্যা হয়ে থাকে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও কূটনীতির ইস্যুতে পরিণত হয়। কক্সবাজার অঞ্চলের বনভূমি, স্থানীয় শ্রমবাজার এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো জনসংখ্যাগত সংকট একবার সৃষ্টি হলে তার প্রভাব দশকের পর দশক বহন করতে হয়। তাই সম্ভাব্য নতুন সংকটের লক্ষণ দেখা দিলে সেটিকে শুরুতেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনার সময় প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট এবং অযোগ্য ভোটার রয়েছে। একই সঙ্গে সমালোচকরা অভিযোগ করছেন যে এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

আসামের এনআরসি প্রক্রিয়ায়ও অতীতে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল, যা নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এই অঞ্চলে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন প্রশ্ন বহু বছর ধরেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।

 

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নাগরিকত্বের প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রশ্নটি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার ও পরিচয় নিয়ে যখন রাজনৈতিক মেরূকরণ বৃদ্ধি পায়, তখন তার সামাজিক অভিঘাতও বেড়ে যায়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন পরিস্থিতিতে অনেক মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সেই অনিশ্চয়তা যদি বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া সীমান্তের উভয় পাশেই অনুভূত হতে পারে।

 

প্রশ্ন হলো, যদি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বাড়তে থাকে, তাহলে এর প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়বে?

 

ইতিহাস বলে, দক্ষিণ এশিয়ায় জনসংখ্যা স্থানচ্যুতি কখনো কেবল একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তাহীন, বঞ্চিত বা অচলাবস্থায় মনে করে, তখন তারা আশ্রয়ের পথ খোঁজে। ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ ও জটিল সীমান্ত রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে যদি সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বড় ধরনের জনচাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেই চাপের একটি অংশ বাংলাদেশের দিকেও ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময় সীমান্তে “পুশ-ইন” নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তে আটক, অনুপ্রবেশের চেষ্টা কিংবা জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সীমান্তে ৬৮ স্থানে নিয়ম লঙ্ঘন করে অবৈধ ভাবে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সহ বিভিন্ন কার্যক্রমের অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি আলাদা এবং সরকারি যাচাই প্রয়োজন, তবুও এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

 

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কেবল কাঁটাতারের বেড়া বা টহল বাড়ানোর বিষয় নয়। আধুনিক বিশ্বে সীমান্ত নিরাপত্তা মানে তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি, কার্যকর কূটনীতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম পরিকল্পনা। রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সংকট শুরু হওয়ার পর নয়, সংকটের পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কারণ বাস্তবতা হলো, সীমান্তে একদিনে হাজার মানুষের চাপ তৈরি হয় না; তার আগে ছোট ছোট ঘটনাই বড় সংকটের পূর্বাভাস দেয়।

 

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা কি প্রস্তুত?

 

রোহিঙ্গা সংকটের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, একটি বড় মানবিক বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব কতটা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। নতুন করে যদি সীমান্তে অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব শ্রমবাজার, সামাজিক অবকাঠামো, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর পড়বে।

 

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নকে কোনোভাবেই মানবিকতার বিপরীতে দাঁড় করানো উচিত নয়। বাংলাদেশ অতীতেও মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। কিন্তু মানবিকতার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে মানবিক এবং সতর্ক দুই ভূমিকাই পালন করতে হয়।

 

এ মুহূর্তে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সীমান্ত পরিস্থিতির নিয়মিত মূল্যায়ন, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোরও উচিত এ বিষয়কে জাতীয় ইস্যু হিসেবে দেখা। সীমান্ত নিরাপত্তা কোনো দলীয় বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

 

রাজনীতি অবশ্যই চলবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্যও থাকবে। কিন্তু যখন সীমান্তে সম্ভাব্য ঝড়ের পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে, তখন জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

 

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, আমরা মানবিক। কিন্তু মানবিক হতে হলে প্রথমে রাষ্ট্রকে সক্ষম থাকতে হয়। সেই সক্ষমতা রক্ষার জন্য এখনই সময় সীমান্তে নজর দেওয়ার।

 

 

লেখক,

হাবিব আল মিসবাহ

শিক্ষার্থী : আল-কুরআন এণ্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মোবাইল : ০১৬১১-৫৬৩৮১৯

মেইল : hmh42242@gmail.com

লেখক: উপ-দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!