স্বপ্নের করিডোর, না কৌশলের ফাঁদ?
স্বপ্নের করিডোর, না কৌশলের ফাঁদ?
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর ও আমাদের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো
২৬ জুন ২০২৬। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সাংবাদিকদের সামনে যে ঘোষণা দিলেন, তা শুধু ঢাকার সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলায়নি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন রেখা এঁকে দিয়েছে। ঘোষণা ছিল, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব এসেছে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে। এই একটি বাক্যেই একত্রিত হয়েছে কয়েক দশকের অসমাপ্ত স্বপ্ন, আঞ্চলিক সহযোগিতার ইতিহাস আর ভবিষ্যতের এক অনিশ্চিত কৌশলগত হিসাব। ঢাকায় খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই স্বাভাবিকভাবে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে একদল উচ্ছ্বসিত, অন্যদল সন্দিহান। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই দলের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।
পুরনো স্বপ্নের নতুন পোশাক-
এই ধারণাটি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি। এর শিকড় গেছে নব্বইয়ের দশকে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রথমবারের মতো এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মাল্টিমোডাল পরিবহন সংযোগের ধারণাটি সামনে আনেন। সেই বীজ থেকে ১৯৯৯ সালের আগস্টে কুনমিংয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা BCIM আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম। ২০১৩ সালের মে মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াং ভারত সফরে গেলে ভারত ও চীন যৌথ বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো সরকারি পর্যায়ে BCIM অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের অঙ্গীকার করে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারও ইতিবাচক সাড়া দেয়।
কিন্তু স্বপ্নটা বেশিদিন টেকেনি। ভারত ২০১৭ ও ২০১৯ সালের BRI ফোরাম বর্জন করে এবং ২০১৯ সালে চীন নিজেই দ্বিতীয় BRI ফোরামের যৌথ ঘোষণায় BCIM-এর নামটি বাদ দিয়ে দেয়। করিডোরের ধারণাটি কার্যত মৃত হয়ে পড়ল। এরপর চীন নতুন কৌশলে এগোয় — ভারতকে বাদ দিয়ে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর বা CMEC দাঁড় করানো হয়। এবার সেই CMEC-কে বিস্তৃত করে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রস্তাব এলো। ত্রিভুজের নতুন সংস্করণ ভারত ছাড়া।
চীন যা চায়-
চীনের এই উৎসাহের কারণ বুঝতে হলে একটু ভূগোলের দিকে তাকাতে হবে। চীনের শক্তি আমদানির প্রায় আশি শতাংশ মালাক্কা প্রণালীর মধ্য দিয়ে আসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি সংকীর্ণ জলপথ, যা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ থেকে ইউনান পর্যন্ত যে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন ইতিমধ্যে চালু আছে, সেটি মূলত সেই মালাক্কা-নির্ভরতা কমানোর একটি স্থলপথের বিকল্প। চীনের ইউনান প্রদেশ ভূপরিবেষ্টিত বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তার দীর্ঘদিনের প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দর সেই সংযোগের দরজা হয়ে উঠলে চীনের কৌশলগত মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যস্থান পূরণ হয়। সহজ কথায়, চীনের জন্য এই করিডোর কেবল বাণিজ্যের সুযোগ নয় এটা একযোগে শক্তি নিরাপত্তা, ভূকৌশলগত উপস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন। এই বাস্তবতাটা মাথায় রেখেই বাংলাদেশকে আলোচনায় বসতে হবে।
বাংলাদেশ যা পেতে পারে-
তবে চীনের কৌশলগত স্বার্থ থাকলেই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায় না। সঠিক শর্তে দুই পক্ষের স্বার্থ একই সাথে পূরণ হওয়া সম্ভব। এই করিডোর বাস্তবে রূপ নিলে সড়ক, রেলপথ, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশাল চীনা বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়। চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক হাবে পরিণত করার যে স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার কাগজে আটকে ছিল, সেটি বাস্তবে রূপ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোও এই বন্দর থেকে সেবা পেলে রাজস্ব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণে বাড়বে। এর বাইরে আছে বাজারের প্রশ্ন। বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ এখনও কঠিন। একটি কার্যকর স্থল ও সমুদ্রপথের সংমিশ্রণ সেই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে। পোশাক শিল্পনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বৈচিত্র্যময় রপ্তানিমুখী অর্থনীতির দিকে যাওয়ার জন্য এই ধরনের আঞ্চলিক সংযোগ অপরিহার্য।
মিয়ানমার: করিডোরের ভেতরের ক্ষত-
কিন্তু এই সুযোগের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন মিয়ানমার। করিডোরের পুরো মধ্যবর্তী অংশ মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে যাবে, বিশেষত রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে। আর রাখাইন এই মুহূর্তে সংঘাতের কেন্দ্রভূমি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের বাস্তবতা হলো নেপিদোতে বসে জান্তা সরকার চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে, কিন্তু মাঠের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কিয়াউকফিউতে চীনের অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ১৪ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তীব্র সংঘর্ষের কারণে সরিয়ে নিতে হয়েছে। চীন যে মুসে-মান্দালে রেলপথ প্রকল্পের কথা বলছে, তার জন্য বিশেষ কমিটি তৈরি হয়েছে কিন্তু কমিটি তৈরি হওয়া মানেই প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়। চীন এই বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তবু সরে আসতে রাজি নয় কারণ সেই শূন্যস্থান ভারত, জাপান বা যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করে নিতে পারে। তাই চীনের পথ কৌশলগত ধৈর্যের মিয়ানমারের নিজস্ব গতিতে, সুযোগের অপেক্ষায় এগিয়ে চলা। বাংলাদেশকে এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে বাস্তবায়নের সময়রেখা নিয়ে সাবধানী আশাবাদী হওয়া দরকার।
রোহিঙ্গা: উপেক্ষা করা যাবে না যে প্রশ্ন-
এই আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রশ্নটিকে আলাদা করে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে দশ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা রয়েছে যারা এসেছে মূলত রাখাইন রাজ্য থেকে, ঠিক সেই রাখাইন যার মধ্য দিয়ে এই করিডোর যাওয়ার কথা। চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্রয়োজনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে মধ্যস্থতা করা হবে। এটি ইতিবাচক সংকেত, তবে এখনও কেবল ঘোষণার পর্যায়ে। প্রশ্ন হলো রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান না হলে বাংলাদেশ কি নৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রেখে রাখাইনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি করিডোরে সক্রিয় অংশীদার হতে পারবে? এ কারণেই রোহিঙ্গা ইস্যুকে ‘আলাদা মানবিক সমস্যা’ হিসেবে নয়, করিডোর চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য শর্ত হিসেবে দেখতে হবে প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট মাইলস্টোন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চুক্তির কাগজে লেখা থাকতে হবে।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি: ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যরা
এই করিডোরকে শুধু দুই দেশের অর্থনৈতিক চুক্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এখন ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ভারতের দৃষ্টিতে এই করিডোরের অর্থ পশ্চিমে CPEC-এর পর এবার পূর্ব সীমান্তে আরেকটি চীনা করিডোর, যা তার সামুদ্রিক কৌশলকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবকাঠামো উদ্যোগ সব মিলিয়ে এক ধরনের বহুপক্ষীয় প্রতিযোগিতা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি করিডোরে যুক্ত হয়, তাহলে তাকে একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা এবং অন্য অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক দুটি ট্র্যাকে কূটনীতি চালাতে হবে। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি কোনো এক পক্ষের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি না করে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?
ঋণের ঝুঁকি: অতীতের শিক্ষা-
বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে মিশ্র। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর, পাকিস্তানের CPEC এবং মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ এসব জায়গায় ঋণের শর্ত, রাজস্ব ভাগাভাগির মডেল ও স্থানীয় শ্রমশক্তির ব্যবহার নিয়ে পরে কঠিন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার নিজেই কিয়াউকফিউ প্রকল্পের আকার একাধিকবার ছোট করেছে অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার ঝুঁকিতে। ‘ডেট ট্র্যাপ’ শব্দটি নিয়ে অনেক অতিরঞ্জন থাকলেও অস্বচ্ছ ঋণশর্ত ও দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যেকোনো দেশকে দীর্ঘমেয়াদে বিপদে ফেলতে পারে এটা বাস্তবতা। তাই করিডোর আলোচনায় বসার আগেই নির্ধারণ করতে হবে কোন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হবে, কোথায় ইকুইটি বিনিয়োগ বা যৌথ উদ্যোগ চাওয়া হবে, স্থানীয় শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কতটা থাকবে এবং কোনো প্রকল্প ব্যর্থ হলে দায়বণ্টনের কাঠামো কী হবে।
যা করতে হবে-
এই সব জটিলতার মধ্যেও বলা ঠিক হবে না যে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং বলা দরকার বাংলাদেশকে নিজের শর্তে এগোতে হবে।
সবার আগে দরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা থাকবে বাংলাদেশ এই করিডোর থেকে কী চায় এবং কীভাবে তা পেতে চায় কেবল এই সরকারের মেয়াদ নয়, আগামী দুই দশকের জাতীয় স্বার্থ মাথায় রেখে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাস্তবায়নের সময়রেখা নিয়ে অতিমাত্রায় আশাবাদী না হয়ে ধাপে ধাপে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে করিডোর চুক্তির অবিচ্ছেদ্য শর্ত হিসেবে রাখতে হবে। ঋণ ও বিনিয়োগের কাঠামো নিয়ে আগে থেকেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে এবং বড় প্রকল্পে স্থানীয় শ্রমশক্তি ও কোম্পানির নির্দিষ্ট অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চীন ধৈর্যশীল খেলোয়াড়। বেইজিং দশকের পর দশক ধরে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশকেও সেই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের কোলে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এই অবস্থানটি একটি সম্পদ, কিন্তু কেবল তখনই, যখন এটি সচেতনভাবে কাজে লাগানো হয়।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয় এটি আমাদের কূটনৈতিক দূরদৃষ্টি, অর্থনৈতিক সাহস এবং নৈতিক অবস্থানের সম্মিলিত পরীক্ষা। স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি প্রশ্ন করার সাহসটুকু ধরে রাখলেই এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য সত্যিকারের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। আর প্রশ্ন না করলে, স্বপ্নের করিডোর কখনো কখনো কৌশলের ফাঁদে পরিণত হতেও বেশি সময় লাগে না।
মোঃ তায়ীম খান
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
