মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নারীর শ্রমে অর্থনীতির চাকা, তবু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কোথায়?

Author

Muhammad Hafizur Rahman , Dhaka College

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ১৬৮ বার

‎”পৃথিবীর যা কিছু মহান সৃষ্টির চির কল্যাণকর ; অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”

‎

‎একটি পোশাক কারখানার সেলাই মেশিনের সামনে বসে কাজ করছিলেন সুমি আক্তার মিশু। তাঁর হাতের সেলাইয়ে তৈরি হচ্ছিল পোশাক, যে পোশাক দেশের রপ্তানি আয়ে ভূমিকা রাখে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সেই উৎপাদনের চাপে, কর্মক্ষেত্রে অপমানজনক আচরণের অভিযোগের মধ্যে, থেমে গেল তাঁর জীবন। সাভারের আশুলিয়ায় সুমি আক্তার মিশুর মৃত্যু আমাদের সামনে শুধু একজন শ্রমিকের মৃত্যুর প্রশ্নই রাখেনি; এটি সামনে এনেছে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা নারীদের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার নিয়ে গভীর সংকটের প্রশ্ন।

‎

‎২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর আশুলিয়ার আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে কর্মরত অবস্থায় ২৭ বছর বয়সী সুমির মৃত্যু হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণে মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে এক কর্মকর্তার আক্রমণাত্মক আচরণের কথা উঠে এসেছে। অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চাওয়া, উৎপাদনের চাপ এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

‎

‎সুমির মৃত্যু তাই নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পেছনে যাঁদের শ্রম রয়েছে, তাঁদের জীবন ও অধিকার রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন।

‎

‎অর্থনীতির চালিকাশক্তি নারী, অথচ স্বীকৃতি কোথায়?

‎

‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদান কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও যোগ্যতার ফল। তৈরি পোশাকশিল্প থেকে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে চা-বাগান, নির্মাণশিল্প থেকে সেবা খাত অসংখ্য ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিদিন উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখছেন।

‎

‎বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ২০২৫ সালে রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে এবং অর্থনীতিতে এর অবদান জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ। এই শিল্পের শ্রমশক্তিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে পোশাকশ্রমিক নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অংশ।

‎

‎বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সামাজিক রীতিনীতি, নিরাপত্তার অভাব ও পরিচর্যার দায়িত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই কর্মসংস্থানকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই করাও জরুরি।

‎

‎পরিসংখ্যানের আড়ালে নারীর কর্মজীবনের কঠিন বাস্তবতা

‎

‎বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর বরাত দিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানিয়েছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী। একই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কর্মরত নারীদের ৯৬.৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক নারী এমন কাজে যুক্ত, যেখানে নিয়মিত কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

‎

‎বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার ডেটা পোর্টালের আইএলও-ভিত্তিক ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮.৬ শতাংশ; পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮০.৪ শতাংশ। এই ব্যবধান দেখায়, কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ এখনো শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছেন। আবার যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অনেকেই নিম্ন মজুরি, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির মুখে থাকেন।

‎

‎এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: যে নারী নিজের শ্রম দিয়ে পরিবারের ব্যয় মেটাচ্ছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তাঁর কর্মক্ষেত্র কেন নিরাপদ হবে না? অসুস্থ হলে ছুটি চাওয়া কেন অপরাধের মতো বিবেচিত হবে? উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে কেন তাঁকে অপমান সহ্য করতে হবে?

‎

‎অর্থনীতির হিসাবের খাতায় উৎপাদন, রপ্তানি ও প্রবৃদ্ধির সংখ্যা থাকে। কিন্তু সেই সংখ্যা অর্জনের পেছনে একজন নারী কত ঘণ্টা কাজ করেছেন, কতটা মানসিক চাপ সহ্য করেছেন, কিংবা কতটা অনিরাপত্তা নিয়ে ঘরে ফিরেছেন এসব হিসাব সচরাচর সামনে আসে না।

‎

‎নারীর শ্রমের মূল্য আছে, কিন্তু মর্যাদা কি আছে?

‎

‎আমাদের সমাজে নারীর অবদানকে প্রায়ই স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কর্মজীবী নারী কারখানায় কাজ করেন, বাড়ি ফিরে পরিবারের যত্ন নেন, সন্তানদের দেখাশোনা করেন; গ্রামীণ নারী কৃষিকাজের পাশাপাশি সংসার সামলান। কিন্তু এই শ্রমের সবটুকু অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতি পায় না।

‎

‎বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীরা নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হতে পারেন। অনেকের নিয়োগপত্র নেই, নিয়মিত ছুটি নেই, মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, আবার অভিযোগ জানালেও চাকরি হারানোর ভয় থাকে। কর্মক্ষেত্রে কর্তৃত্বের অপব্যবহার, অপমানজনক আচরণ এবং হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এই ভয় আরও বাড়ে।

‎

‎সুমির ঘটনায় ওঠা অভিযোগগুলো তাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগেভাগে দোষী ঘোষণা না করে, একই সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী পক্ষ যেন জবাবদিহি এড়াতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

‎

‎পরিবর্তনের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ চাই

‎

‎প্রথমত, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ভয় দেখানো ও হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারী শ্রমিক যেন প্রতিশোধমূলক আচরণ বা চাকরি হারানোর ভয়ে নীরব থাকতে বাধ্য না হন।

‎

‎দ্বিতীয়ত, অসুস্থ শ্রমিকের চিকিৎসা, জরুরি ছুটি ও বিশ্রামের অধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হতে পারে না।

‎

‎তৃতীয়ত, শ্রম আইন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ নিষ্পত্তি, শ্রমিকদের সচেতনতা এবং ব্যবস্থাপকদের মানবিক আচরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

‎

‎চতুর্থত, নারীদের ন্যায্য মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত, শিশুযত্নের ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠন ও কর্মক্ষেত্রের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা সম্মানের সঙ্গে নিজেদের অধিকার দাবি করতে পারেন।

‎

‎পঞ্চমত, সরকার, শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ নিরাপদ কর্মপরিবেশ কেবল শ্রমিকের কল্যাণ বাড়ায় না; কর্মদক্ষতা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও শক্তিশালী করে।

‎

‎সুমির মৃত্যু আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

‎

‎একটি দেশের উন্নয়ন কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো সেই দেশের একজন সাধারণ শ্রমিক কতটা নিরাপদে কাজ করতে পারেন, তাঁর অধিকার কতটা সুরক্ষিত এবং তাঁর মর্যাদা কতটা সম্মানিত হয়।

‎

‎সুমি আক্তার মিশু ছিলেন একজন শ্রমিক, একজন মা, একজন স্ত্রী এবং একটি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। তাঁর জীবনের মূল্য কোনো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বা কারখানার হিসাবের চেয়ে কম নয়। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি যে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে, তা কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণেই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবু ন্যায়বিচার, স্বচ্ছ তদন্ত এবং কর্মক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের পথ তৈরি করা সম্ভব।

‎

‎যে নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান, তাঁদেরই যদি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সম্মানের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক? যে শ্রম দেশের রপ্তানি বাড়ায়, সেই শ্রমিকের জীবন যদি অবহেলিত হয়, তাহলে প্রবৃদ্ধির সাফল্য কার জন্য?

‎

‎আজ সময় এসেছে নারীর অবদানকে শুধু প্রশংসার ভাষায় নয়, বাস্তব অধিকার ও নিরাপত্তার মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়ার। কারণ নারীরা অর্থনীতির সহায়ক শক্তি মাত্র নন; তাঁরা অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

‎

‎দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরানো নারীদের আর অবহেলা নয়, চাই মর্যাদা। নির্যাতন নয়, চাই নিরাপত্তা। প্রতিশ্রুতি নয়, চাই ন্যায়বিচার ও কার্যকর পরিবর্তন। সুমির মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রমাণ করতে হবে এই দেশের উন্নয়নে নারীর শ্রম যেমন অপরিহার্য, তেমনি তাঁদের জীবন ও মর্যাদাও সমান মূল্যবান।

‎

‎    – হাফিজুর রহমান, শিক্ষার্থী রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ (DCU)

‎

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।