সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

‎নিজেকে জানো: সক্রেটিসের অমর বাণী ও আত্ম-অনুসন্ধানের দর্শন

Author

Muhammad Hafizur Rahman , Dhaka College

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৪৭২ বার

নিজেকে জানা; শুনতে সহজ মনে হলেও মানুষের জীবনে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন অনুসন্ধান। আমরা প্রতিনিয়ত অন্যকে বিচার করি, অন্যের ভুল খুঁজি, অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করি; অথচ নিজের চিন্তা, বিশ্বাস, দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে নিরপেক্ষভাবে বোঝার চেষ্টা করি কতটুকু? প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক সক্রেটিস মানুষের সামনে এমনই এক প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক, “নিজেকে জানো।”

‎

‎আত্মজিজ্ঞাসার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

‎

‎পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে সক্রেটিস (আনুমানিক ৪৬৯–৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব) এক অনন্য নাম। তিনি কোনো গ্রন্থ লিখে যাননি। তাঁর জীবন, চিন্তা ও দর্শন সম্পর্কে আমাদের প্রধান ধারণা এসেছে তাঁর শিষ্য প্লেটো ও জেনোফনের রচনা এবং সমসাময়িক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিসের উপস্থাপনা থেকে। ফলে ঐতিহাসিক সক্রেটিসের প্রকৃত চিন্তা সম্পর্কে কিছু বিতর্ক থাকলেও দর্শনের ইতিহাসে তাঁর প্রভাব অনস্বীকার্য।

‎

‎‘Know Thyself’ বা ‘নিজেকে জানো’ বাণীটি সাধারণভাবে সক্রেটিসের নামে পরিচিত হলেও ঐতিহাসিকভাবে এর উৎস আরও প্রাচীন। প্রাচীন গ্রিসের ডেলফিতে দেবতা অ্যাপোলোর মন্দিরের সঙ্গে এই বাণীটি ঐতিহ্যগতভাবে যুক্ত ছিল। প্লেটোর প্রোটাগোরাস সংলাপে প্রাচীন গ্রিসের জ্ঞানী ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রজ্ঞার সঙ্গে এ ধরনের বাণীর সম্পর্ক পাওয়া যায়। তাই সক্রেটিসকে এই বাণীর স্রষ্টা বলার চেয়ে বলা অধিক যুক্তিসংগত যে তিনি আত্মজ্ঞান ও আত্মপরীক্ষার দর্শনের মাধ্যমে বাণীটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছিলেন। “প্লেটোর প্রোটাগোরাস ও চার্মিদিস সংলাপবিষয়ক আলোচনা”

‎

‎নিজেকে জানার অর্থ কী?

‎

‎নিজেকে জানা মানে কেবল নিজের নাম, পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত থাকা নয়। এর অর্থ নিজের চিন্তা, উদ্দেশ্য, আবেগ, মূল্যবোধ, সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আমি কী বিশ্বাস করি, কেন বিশ্বাস করি, আমার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিনির্ভর এবং আমার আচরণ অন্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই আত্মজিজ্ঞাসার মূল কথা।

‎

‎সক্রেটিসের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন থাকা। প্লেটোর অ্যাপোলজি বা সক্রেটিসের আত্মপক্ষসমর্থন সংলাপে ডেলফির দৈববাণীকে কেন্দ্র করে তাঁর অনুসন্ধানের কথা পাওয়া যায়। সক্রেটিস এমন মানুষদের প্রশ্ন করতেন, যাঁরা নিজেদের জ্ঞানী বলে মনে করতেন। তাঁর অনুসন্ধানে দেখা যেত, অনেকেই এমন বিষয়ে নিশ্চিত দাবি করছেন, যে বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ। এখানেই সক্রেটিসের দার্শনিক প্রজ্ঞা নিজে যা জানি না, তা জানি না বলে স্বীকার করার মধ্যেও জ্ঞানের সূচনা রয়েছে।

‎

‎এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, আত্মজ্ঞান আত্মপ্রশংসার নাম নয়; বরং নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস। যে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে, সে নতুন কিছু শেখার জন্য উন্মুক্ত থাকে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি নিজের ধারণাকেই চূড়ান্ত সত্য মনে করে, তার চিন্তার বিকাশ থেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

‎

‎আত্মপরীক্ষা ও নৈতিক জীবনের সম্পর্ক

‎

‎সক্রেটিসের দর্শনে প্রশ্ন করা ছিল সত্য অনুসন্ধানের প্রধান পদ্ধতি। তিনি সরাসরি উপদেশ দেওয়ার পরিবর্তে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলে মানুষের প্রচলিত ধারণাকে যাচাই করতেন। সাহস কী, ন্যায়বিচার কী, ভালো জীবন কাকে বলে এসব বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে কোনো ধারণা প্রচলিত বলেই তা সত্য হয়ে যায় না।

‎

‎প্লেটোর অ্যাপোলজি সংলাপে সক্রেটিসের সঙ্গে যুক্ত একটি বিখ্যাত বক্তব্য হলো, ‘পরীক্ষাহীন জীবন মানুষের বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ যার ইংরেজি অনুবাদ সাধারণত The unexamined life is not worth living হিসেবে পরিচিত। বক্তব্যটির তাৎপর্য এই নয় যে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের জীবন নিয়ে সংশয়ে থাকতে হবে। বরং জীবনকে অর্থপূর্ণ করতে নিজের সিদ্ধান্ত, নৈতিকতা ও বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় যাচাই করা প্রয়োজন।

‎

‎আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের ভুল বুঝতে সাহায্য করে; আত্মসমালোচনা তাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়; আর সংশোধনের মানসিকতা তাকে দায়িত্বশীল করে তোলে। তাই নিজেকে জানার সঙ্গে নৈতিক উন্নতি ও মানবিক আচরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

‎

‎আধুনিক সমাজে ‘নিজেকে জানো’ কেন জরুরি?

‎

‎বর্তমান পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অর্থনৈতিক সাফল্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমান জনপ্রিয়তার মাধ্যমে। অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করা, বাহ্যিক স্বীকৃতির জন্য নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া কিংবা জনপ্রিয় মতামতকে যাচাই না করেই গ্রহণ করা এসব প্রবণতা আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করতে পারে।

‎

‎বিশেষ করে তরুণদের জীবনে আত্মজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, পেশা নির্বাচন, সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের আগ্রহ, যোগ্যতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়; নিজের সামর্থ্য ও বাস্তবতা বুঝে অর্থপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করাও জরুরি।

‎

‎একই সঙ্গে আত্মজ্ঞান সামাজিক দায়িত্ববোধেরও ভিত্তি হতে পারে। যে ব্যক্তি নিজের পক্ষপাত ও ভুল বুঝতে শেখে, সে ভিন্নমতকে সহনশীলভাবে বিবেচনা করার সুযোগ পায়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিসরে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠায় এই মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

‎

‎তবে নিজেকে জানা মানে কেবল নিজের ভেতরে ডুবে থাকা নয়। বরং নিজের অবস্থান বুঝে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা, অধিকার ও মর্যাদাকেও উপলব্ধি করা। আত্মজ্ঞান যদি মানুষকে আরও অহংকারী করে তোলে, তবে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ; আর যদি তাকে বিনয়ী, ন্যায়পরায়ণ ও সহমর্মী করে তোলে, তবে তা জীবনের জন্য অর্থবহ হয়ে ওঠে।

‎

‎উপসংহার: নিজের কাছে ফিরে আসার সাহস

‎

‎প্রযুক্তির বিস্তার, তথ্যের প্রাচুর্য ও প্রতিযোগিতামূলক জীবনের এই সময়ে মানুষ পৃথিবী সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তথ্য জানতে পারছে। কিন্তু তথ্যের আধিক্য মানেই আত্মজ্ঞান নয়। পৃথিবীকে জানার পাশাপাশি নিজের চিন্তা ও আচরণকে বোঝার প্রয়োজনও তাই ফুরিয়ে যায়নি।

‎

‎সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ কোনো একদিনে সম্পন্ন করার মতো কাজ নয়; এটি সারাজীবনের অনুশীলন। নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, অজ্ঞতাকে স্বীকার করা এবং প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করা এসবের মধ্য দিয়েই আত্মজ্ঞান গভীর হয়।

‎

‎শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত উন্নতি কেবল সে কত কিছু অর্জন করল, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সে নিজেকে কতটা বুঝল এবং সেই বোঝাপড়া দিয়ে নিজের জীবন ও সমাজকে কতটা উন্নত করল, তার ওপরও নির্ভর করে। তাই আড়াই হাজার বছর আগের সেই আহ্বান আজও আমাদের সামনে অমীমাংসিত এক প্রশ্ন রেখে যায় আমরা পৃথিবীকে বদলানোর আগে নিজেদের চিনতে শিখেছি কি?

‎    – হাফিজার রহমান, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ – DCU

‎

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।