সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

রণক্ষেত্র থেকে রান্নাঘর: সংকটের গল্প

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ পাঠ: ৯২ বার

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে যুদ্ধ কেবল সীমান্তের মানচিত্র বদলায় না; বদলে দেয় বাজার, অর্থনীতি, মানুষের দৈনন্দিন জীবনও। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে খাদ্য, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রতিটি স্তরে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ এবং পূর্ব ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের বহুমাত্রিক অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। এর সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারে।

 

আজকের পৃথিবীতে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ একটি জটিল বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি অঞ্চলের যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের দেশের খাদ্যের দামে প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় এই আন্তঃনির্ভরশীল ব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

 

বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থার একটি বড় অংশ নির্ভর করে কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সরবরাহ রুটের ওপর। পূর্ব ইউরোপের কৃষিভিত্তিক অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্র এই ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ। যখন এই দুটি অঞ্চলই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দেয়।

 

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের আগে থেকেই বিশ্ব খাদ্যবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল এই দুই দেশের।যুদ্ধপূর্ব পরিসংখ্যান মতে, ইউক্রেন একাই বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ গম, ১৩ শতাংশ বার্লি এবং ১৫ শতাংশ ভুট্টা রপ্তানি করত; এছাড়াও ৪২ শতাংশ সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান অংশীদারও ইউক্রেন। অন্যদিকে রাশিয়া বৈশ্বিক গম বাজারের শীর্ষ রপ্তানিকারক, তারা বিশ্বের মোট গমের ১৮ শতাংশের বেশি এবং প্রায় ১৪ শতাংশ সার সরবরাহ করে থাকে।

 

যখন এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তখন প্রথম যে ধাক্কাটি বিশ্ববাজারে লাগে তা হলো শস্য সরবরাহে। কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলো, ইউক্রেনের প্রায় ৯৫ শতাংশ শস্য কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে রপ্তানি হতো। এছাড়াও ওডেসা, ইলিচেভস্ক ও চের্নোমরস্ক বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে বিশাল পরিমাণ শস্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাত।যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে কোটি কোটি টন শস্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। এই পরিস্থিতি শুধু ইউরোপ বা এশিয়াকেই প্রভাবিত করেনি; আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ সরাসরি খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে পড়ে।

 

খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কৃষিতে ব্যবহৃত সেচ ব্যবস্থা, যান্ত্রিক কৃষিকাজ, খাদ্য পরিবহন; সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। ফলে যখন জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন কৃষির ব্যয়ও বেড়ে যায়। রাশিয়া – ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ব জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। এই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে। কারণ সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে সারের দামও বেড়ে যায়। ফলাফল হিসেবে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হন অথবা উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যের দামে প্রতিফলিত হয়।

 

এই প্রেক্ষাপটে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরু হয়; তখন বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য শুধু জ্বালানির কেন্দ্র নয়; এটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথেরও কেন্দ্র। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রধান পথ হলো ‘হরমুজ প্রণালী’। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সার পরিবহন হয়। এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বৈশ্বিক তেল রপ্তানি, ২০ শতাংশ এলএনজি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ সার বাণিজ্য চলাচল করে।

 

যখন এই রুটে সামরিক উত্তেজনা বা হামলার ঘটনা ঘটে, তখন জাহাজ চলাচল কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, বীমা খরচ বেড়ে যায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে। সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে এই অঞ্চলে তেল পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। কিছু বিশ্লেষণে এটিকে ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে পেট্রোলের জন্য ১ কিলোমিটারের বেশি যানবাহনের সারি দেখা গেছে।

 

জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে গিয়ে পড়ে। কারণ সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, বিশেষ করে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন পরিবহনের বড় অংশও এই অঞ্চল দিয়ে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব পণ্যের পরিবহন ব্যাহত হলে সার উৎপাদন কমে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বেড়ে যায়। সারের দাম বাড়লে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। এতে কৃষি উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য সরবরাহ সংকুচিত হয়। ফলে খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

 

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি চক্রাকার সংকট তৈরি করে; যেখানে যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়ায়, জ্বালানির দাম বাড়লে সারের দাম বাড়ে, সারের দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়, আর খাদ্য উৎপাদন কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ নিজেদের খাদ্য চাহিদার বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করে। এই দেশগুলোতে খাদ্যের দাম বাড়লে তা সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।

 

খাদ্য সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জল্পনা-কল্পনা বা স্পেকুলেশন। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যৎ দামের আশঙ্কায় খাদ্য মজুত করতে শুরু করেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম আরও বাড়ে। এছাড়া অনেক দেশ নিজেদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রপ্তানি সীমিত করে দেয়। ২০২২ সালের পর থেকে বিশ্বের অনেক দেশ চাল, গম বা অন্যান্য খাদ্যশস্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যায়।

 

বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও কম নয়। খাদ্যের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়।অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু খাদ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক গতিপথকেও প্রভাবিত করে।

 

ভবিষ্যতে এই সংকট মোকাবিলার জন্য খাদ্য উৎপাদনের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ যতদিন থাকবে, ততদিন খাদ্য ও জ্বালানির বাজার অস্থির থাকবে। আর এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে বিশ্বের সাধারণ মানুষকে।

 

তাই বিশ্ব রাজনীতির সংঘাত শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের থালার ভাতের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি সেই সত্যটিকেই আবারও স্পষ্ট করে তুলছে, যেখানে একটি যুদ্ধ হাজার মাইল দূরের মানুষের খাবারের প্লেটকে খালি করে দিতে পারে।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!