সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

তিস্তা: একটি রাজনৈতিক নদী

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ২০ বার

পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু নদী কেবল নদী নয়। নীলনদ মিসরকে সভ্যতা দিয়েছে, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস মেসোপটেমিয়াকে জন্ম দিয়েছে, সিন্ধু ভারতীয় উপমহাদেশকে পরিচয় দিয়েছে। আবার এমনও নদী আছে, যাদের স্রোত ইতিহাসের চেয়ে বেশি বয়ে নিয়েছে সংঘাত, কূটনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতি। তিস্তা সেই শ্রেণির নদী। বাংলাদেশের কাছে এটি কৃষকের জীবন, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন; ভারতের কাছে এটি উজানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কৌশল; আর চীনের কাছে এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে আরেকটি সম্ভাব্য প্রবেশপথ। তাই তিস্তার পানি কখনোই শুধু পানি নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক মুদ্রা, যা প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যায়, আটকে রাখা যায়, আবার আলোচনার টেবিলে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও তোলা যায়।

 

 বাংলাদেশে যখন তিস্তার চর শুকিয়ে ধুলোর ঝড় ওঠে, তখন সেটি শুধু একটি পরিবেশগত সংকট নয়; সেটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ক্ষমতার অসম বণ্টনের দৃশ্যমান রূপ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি পুরোনো সত্য আছে, যে রাষ্ট্র উজানে থাকে, সে শুধু নদীর উৎসের মালিক হয় না; অনেক সময় ভাটির দেশের রাজনৈতিক স্বস্তি-অস্বস্তিরও নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। নদীর প্রবাহ বন্ধ করে যুদ্ধ জেতা যায় না, কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে চাপের মধ্যে রাখা যায়। এই কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে পানি ক্রমেই তেল, গ্যাস কিংবা বিরল খনিজের মতো কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। 

 

 এই নদীর রাজনীতি বোঝার জন্য মানচিত্রের দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়; ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হয়। হিমালয়ের কোলে সিকিমের হিমবাহ থেকে নেমে আসা তিস্তা একসময় ছিল ভয়ংকর স্রোতস্বিনী। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যা নদীটির গতিপথই পাল্টে দেয়। একসময় এর বড় অংশ গঙ্গা অববাহিকার দিকে প্রবাহিত হতো; পরে তা ব্রহ্মপুত্রের দিকে মোড় নেয়। দেশভাগের পর আন্তর্জাতিক সীমান্ত নদীটিকে দুই রাষ্ট্রে ভাগ করে দেয়। নদী একই রইল, কিন্তু নদীর ওপর অধিকার দুটি রাষ্ট্রের হয়ে গেল। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম নতুন আশার সৃষ্টি করলেও তিস্তার ভাগ্যে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নদীটি ধীরে ধীরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

 

 কোনো রাষ্ট্র তার কৌশলগত সম্পদ সহজে ছেড়ে দেয় না। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে তিস্তা কেবল একটি নদী নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি, সিকিমের জলবিদ্যুৎ, ভবিষ্যতের জলনিরাপত্তা এবং পূর্বাঞ্চলীয় ভূরাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ভারত জানে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহের চরিত্র বদলাচ্ছে। আগামী কয়েক দশকে হিমালয়-নির্ভর নদীগুলোর প্রবাহে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। ফলে আজ যে পানি উদ্বৃত্ত মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই সংকটের কারণ হতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি হিসাব থেকেই নয়াদিল্লি প্রতিটি ফোঁটা পানির ওপর কৌশলগত দৃষ্টি রাখছে।

 

 বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ রাজি নয় বলেই চুক্তি হচ্ছে না। কথাটি সত্য, কিন্তু পূর্ণ সত্য নয়। ভারতের সংবিধানের ফেডারেল কাঠামো রাজ্যগুলোর মতামতকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় সরকারই। যদি কোনো ইস্যুকে দিল্লি তার সর্বোচ্চ কৌশলগত অগ্রাধিকার মনে করত, তবে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বের করার ক্ষমতা তার ছিল এবং এখনও আছে। ফলে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার সমস্ত দায় শুধু কলকাতার ওপর চাপিয়ে দিলে নয়াদিল্লির বৃহত্তর কৌশলগত সিদ্ধান্তকে আড়াল করা হয়। বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গ অনেক সময় একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়।

 

 ভারতের এই অবস্থানকে বোঝার জন্য আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শত্রুও নেই; আছে শুধু স্থায়ী স্বার্থ। বাংলাদেশ বহুবার ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগে সহযোগিতা করেছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করেছে, সংযোগ ও ট্রানজিটে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ভারতের নীতিনির্ধারকেরা প্রতিটি বিষয়কে আলাদা ফাইলে দেখেন। সীমান্ত সহযোগিতা এক ফাইল, বাণিজ্য আরেক ফাইল, বিদ্যুৎ তৃতীয় ফাইল, আর তিস্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ফাইল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় মনে করেছে, এক খাতে সহযোগিতা অন্য খাতের সমস্যার সমাধান সহজ করবে। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রনীতি সেই যুক্তিতে পরিচালিত হয় না। এখানেই দুই দেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য।

 

 স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকার তিস্তাকে প্রতিশ্রুতির ভাষায় ব্যবহার করেছে, কিন্তু জাতীয় কৌশলের ভাষায় নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার ধরন বদলেছে, অগ্রাধিকার বদলেছে, কিন্তু নদীর বাস্তবতা বদলায়নি। উত্তরাঞ্চলের কৃষক আজও জানেন না, আগামী বোরো মৌসুমে তাঁর জমিতে সেচের পানি থাকবে কি না। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার অভাবই তিস্তা প্রশ্নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে।

 

 বাংলাদেশের নদী-রাজনীতির ইতিহাসে যদি কোনো মানুষ সময়ের অনেক আগে ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন, তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কার উদ্দেশে তাঁর লং মার্চকে অনেকেই শুধু গঙ্গার পানির দাবির আন্দোলন হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, ভাসানী আসলে পানির চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটি ভাটির রাষ্ট্র কি উজানের রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ওপর চিরকাল নির্ভর করে বাঁচবে? তাঁর ভাষণে বারবার ফিরে এসেছিল নদীর প্রশ্নকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখার আহ্বান। তিনি বুঝেছিলেন, একবার যদি পানি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে ভবিষ্যতে শুধু গঙ্গা নয়, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, মনু সহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীই একই বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। 

 

 বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল; উভয়েই ক্ষমতার বাইরে থাকলে তিস্তা নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হয়, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কূটনৈতিক ভাষা অনেক নরম হয়ে যায়। এরশাদ সরকারের সময়ও তিস্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিএনপি সরকারের সময়ও হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলেও হয়েছে। প্রত্যেক সরকারই কোনো না কোনো পর্যায়ে জনগণকে আশ্বাস দিয়েছে যে, এবার হয়তো সমাধান হবে। কখনও বলা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উষ্ণতা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে; কখনও বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে; কখনও আবার উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিশ্রুতির সংখ্যা যত বেড়েছে, তিস্তার প্রবাহ তত বাড়েনি।

 

 ২০১১ সালকে অনেকে হারিয়ে যাওয়া সুযোগের বছর বলেন। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। বাংলাদেশের মানুষও সেই প্রত্যাশায় ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে চুক্তি থেমে যায়। এই ঘটনাকে শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকেও একটি শিক্ষা দিয়েছিল যে, কেবল বন্ধুত্বের ভাষা দিয়ে কৌশলগত স্বার্থের সমাধান হয় না।

 

 আমরা ধরে নিই, ভারত কেবল বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার জন্য পানি আটকে রাখে। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। ভারত একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ এবং জলবিদ্যুৎ; সব ক্ষেত্রেই পানির চাহিদা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত তার প্রতিটি আন্তঃসীমান্ত নদীকে ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধ থাকুক বা না থাকুক, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা পানির ওপর নিয়ন্ত্রণকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। এই বাস্তবতা স্বীকার না করলে সমস্যার সমাধানও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

 কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের প্রশ্ন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যদি ভারত তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন তার জাতীয় স্বার্থকে একই দৃঢ়তায় তুলে ধরতে পারবে না? আন্তর্জাতিক নদী আইন ভাটির রাষ্ট্রের ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহারের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও সব রাষ্ট্র একই আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সদস্য নয়, তবুও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নৈতিক ও আইনি যুক্তির মূল্য একেবারে শূন্য নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে এই বিষয়টিকে মূলত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। এতে সম্পর্ক বজায় রাখা সহজ হয়েছে, কিন্তু সমাধান ত্বরান্বিত হয়নি।

 

 এই শূন্যস্থানটিই চীন খুব দ্রুত বুঝে ফেলেছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র কখনো শূন্যস্থান ফেলে রাখে না। যেখানে প্রভাব কমে, অন্য কেউ সেখানে প্রবেশ করে। তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে চীনের আগ্রহকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বেইজিং জানে, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা যায়। তাই তিস্তা অববাহিকার উন্নয়ন, নদীশাসন বা অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব শুধু প্রকৌশলগত নয়; এটি ভূরাজনৈতিকও। আর এই কারণেই তিস্তা এখন আর শুধু ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার বিষয় নয়; এর ছায়ায় বেইজিংও উপস্থিত।

 

 ফলে আজ তিস্তার তীরে দাঁড়িয়ে যে কৃষক ফসলের জন্য পানি চান, তিনি হয়তো বুঝতেও পারেন না যে তাঁর শুকিয়ে যাওয়া জমি আসলে তিনটি রাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার নীরব সাক্ষী। তাঁর কাছে নদী মানে সেচ; রাষ্ট্রগুলোর কাছে নদী মানে প্রভাব। তাঁর কাছে পানি জীবন; রাষ্ট্রের কাছে পানি ক্ষমতা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্বই তিস্তাকে একটি সাধারণ নদী থেকে রাজনৈতিক নদীতে রূপ দিয়েছে।

 

 তিস্তা প্রশ্নে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য সম্ভবত এই যে, এখানে নদী নিয়ে যতটা রাজনীতি হয়েছে, নদী নিয়ে ততটা রাষ্ট্রনীতি গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রনীতি (State Policy) এবং সরকারনীতি (Government Policy) এক জিনিস নয়। সরকার পাঁচ বছর পর বদলাতে পারে, রাষ্ট্রের স্বার্থ বদলায় না। ভারত এই মৌলিক নীতিটা বুঝেছে বলেই সরকার পরিবর্তনের পরও তিস্তা ইস্যুতে তার অবস্থান মোটামুটি একই থেকেছে। বাংলাদেশ সেখানে বারবার নতুন করে শুরু করেছে। প্রতিটি সরকার যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছে যে তিস্তা নামে একটি নদী আছে, তারপর কিছুদিন কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আবার অন্য অগ্রাধিকারে চলে গেছে। ফলে ধারাবাহিক চাপ তৈরির বদলে তৈরি হয়েছে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের ইতিহাস।

 

 এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠে আসে। বাংলাদেশ কি সত্যিই তিস্তাকে তার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি বানাতে পেরেছে? উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্র কোনো ইস্যুকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেয়, সে ইস্যুটি প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তোলে, প্রতিটি যৌথ বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করে, প্রতিটি অর্থনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি আলোচনার কাঠামো তৈরি করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তিস্তা কখনো খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, আবার কখনো একেবারেই নীরব হয়ে গেছে। 

 

 অন্যদিকে ভারত সম্পর্ক পরিচালনায় একটি বিষয় খুব দক্ষতার সঙ্গে করেছে। তারা বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ, রেল ও সড়ক সংযোগ, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব সুবিধা দিয়েছে; ফলে সামগ্রিক সম্পর্ক ইতিবাচক থেকেছে। কিন্তু একই সময়ে তিস্তার মতো কঠিন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থানও পরিবর্তন করেনি। এটিই কূটনীতির বাস্তববাদ (Realism)। কোনো রাষ্ট্র এক হাতে সহযোগিতা দেয়, অন্য হাতে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ধরে রাখে। আবেগ দিয়ে এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না।

 

 বর্তমান সরকার তিস্তা পুনরুদ্ধার ও সমন্বিত উন্নয়নের যে পরিকল্পনার কথা বলছে, তা নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা; এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য ভুলে গেলে চলবে না, নদীর অবকাঠামো উন্নয়ন আর আন্তঃসীমান্ত পানিবণ্টন এক বিষয় নয়। বাংলাদেশ নিজের অংশে যত উন্নয়নই করুক, শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকলে সেই উন্নয়নের সীমাবদ্ধতা থেকেই যাবে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ প্রকল্প প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা তিস্তা চুক্তির বিকল্প নয়।

 

 এখানেই চীনের প্রসঙ্গ আবার সামনে আসে। অনেকেই মনে করেন, চীন যদি তিস্তা ইস্যুতে সংযুক্ত হয় তাহলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তবে বাস্তবতা এত সরল নয়। চীন অর্থ দিতে পারে, প্রকৌশল দিতে পারে, প্রযুক্তি দিতে পারে; কিন্তু ভারতের উজান থেকে পানি এনে দিতে পারে না। ফলে চীনের অংশগ্রহণ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু আন্তঃসীমান্ত পানিবণ্টনের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বরং বিষয়টি ভারত-চীন প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা তৈরি করতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো এক পক্ষের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

 

 তাই তিস্তা বাংলাদেশের কাছে কেবল একটি নদী নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। আমরা কি শুধু অপেক্ষা করব, নাকি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল গড়ে তুলব, যা সরকার বদলালেও বদলাবে না? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের তিস্তা কেবল শুকিয়ে যাওয়া একটি নদী থাকবে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার নতুন প্রতীক হয়ে উঠবে। নদী তার নিজের ভাষায় কখনো রাজনীতি করে না; রাজনীতি করে রাষ্ট্র। আর রাষ্ট্রের প্রজ্ঞাই ঠিক করে দেয়, নদী হবে জীবনধারা, নাকি অনন্ত বিরোধের আরেক নাম।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!