বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ধর্ষণ যখন মহামারী, নীরবতা তখন অপরাধ।

Author

শারমিন রিমা খাতুন , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ পাঠ: ৯ বার

ধর্ষণ যেন আজ এক ভয়াবহ মহামারীতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে ধর্ষণের নতুন নতুন ঘটনার খবর। শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই যেন এই নৃশংসতার শিকার হওয়া থেকে নিরাপদ নয়।ছোটবেলায় মা-চাচিদের মুখে শুনতাম, মেয়েরা নাকি মায়ের গর্ভে এবং মাটির নিচে কবরে ছাড়া কোথাও নিরাপদ নয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। আজ মায়ের গর্ভে থাকা শিশুও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে, আবার মৃত্যুর পর কবরেও নারীর মর্যাদা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রশ্ন জাগে নারী আসলে কোথায় নিরাপদ? চারপাশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, ধর্ষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি রূপ নিয়েছে এক সামাজিক মহামারীতে। মহামারী যেমন মানুষের শরীরকে গ্রাস করে, তেমনি এই ব্যাধি গ্রাস করছে আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক নিরাপত্তাবোধকে।একজন ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন না; তিনি মানসিকভাবে আজীবনের জন্য ক্ষতবিক্ষত হয়ে যান। সমাজের কটূক্তি, অবহেলা এবং বিচারহীনতা সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়, যা তাকে দ্বিতীয়বারের মতো নির্যাতনের শিকার করে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে নানা কারণ। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি, মাদকাসক্তি, নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এসবই ধর্ষণের বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। যখন অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, তখন অন্যদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।শুধু আইন প্রণয়ন করেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধ শেখাতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জেন্ডার-সংবেদনশীল শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রতিটি শিশু নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখে। পাশাপাশি ধর্ষকদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় সৃষ্টি হয়।

আমাদের সমাজ কতটা বিপজ্জনক অবস্থানে পৌঁছেছে, তা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫,৫৬৬টি। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭,০৬৮টিতে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই পৈশাচিকতার শিকার হচ্ছে অবুঝ শিশুরাও। তিন থেকে চার বছরের শিশুও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, আর অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের প্রমাণ গোপন করতে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। চলন্ত গণপরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে নিজের ঘর কোথাও আজ নারী সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতা এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। অপরাধ করেও বিচারের আওতায় না আসার অসংখ্য উদাহরণ অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করেছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত সময়ে কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ১৭ শিশু।বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফৌজিয়া করিম ফিরোজ। তাঁর মতে, আইন দ্রুত বিচারের নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রক্রিয়াগত জটিলতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মহামারী ছড়ানোর পেছনে যেমন কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাস কাজ করে, তেমনি ধর্ষণের মতো অপরাধ বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভাইরাস হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বছরের পর বছর মামলা বিচারাধীন পড়ে থাকে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, দুর্বল তদন্ত, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর সামাজিক চাপের কারণে অনেক অপরাধীই শাস্তি এড়িয়ে যায়। এই দৃশ্যমান বিচারহীনতা নতুন অপরাধীদের জন্য এক ধরনের উৎসাহ হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে অতীতের বেশ কিছু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াস্মিন আক্তার হত্যাকাণ্ড দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। দীর্ঘ নয় বছর পর ২০০৪ সালে অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ১৯৯৯ সালের শাজনীন তাসনিম রহমান হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হতে লেগেছিল ১৮ বছর। ২০১৬ সালের সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার আজও সম্পন্ন হয়নি। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডও আজও বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। চলতি বছরেই সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাঈমা ইরা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। মিরপুরে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু সাময়িক প্রতিবাদ বা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না; দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত না হলে এই শোক, ক্ষোভ ও আলোড়ন কেবল কিছুদিনের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে যাবে।

কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার নাগরিকরা নিরাপদ থাকে। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি প্রতিনিয়ত ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করে, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।আমরা আর কোনো মায়ের কোল খালি দেখতে চাই না। কোনো বোনের আর্তনাদে এই দেশের আকাশ ভারী হোক, সেটাও চাই না। রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সাধারণ জনগণ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই মহামারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তবে কাল হয়তো আমার বা আপনার পরিবারই হবে এই ভয়াবহ অপরাধের পরবর্তী শিকার। তাই এখনই সময় প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। কারণ, এই মহামারীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং নিশ্চিত বিচার।

 

শারমিন রিমা খাতুন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ (২৪-২৫)

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: সদস্য, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!