মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

আঁধারে বরিশাল, ধ্বংসের মুখে কন্যা সন্তান

Author

মিথিলা আক্তার , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৪৩ বার

কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক বিকাশের মূল চাবিকাঠি হলো নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব। আমাদের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নারী সমাজ। সমাজের এই প্রধান অংশটিকে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো পিছিয়ে রেখে কখনোই একটি উন্নত জাতি গঠন করা সম্ভব নয়। তাই সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারীর প্রয়োজনীয়তা ও তার অধিকারকে সবার আগে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারী কোনোভাবেই পরিবারের বোঝা নয়, বরং আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, চরম অর্থনৈতিক দৈন্য এবং কুসংস্কারের বেড়াজাল তাকে কৃত্রিমভাবে বোঝায় রূপান্তরিত করেছে। এর বাস্তব চিত্র আজও স্পষ্ট বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে। সেখানে আজও একটি কন্যাশিশু ভূমিষ্ঠ হলে আনন্দের চেয়ে আশঙ্কার দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, যা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের সভ্যতার মুখে চপোটাঘাত। এই মানসিকতার মূলে রয়েছে শিক্ষার অভাব, তীব্র দারিদ্র্য এবং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার উপর গড়ে ওঠা গোঁড়ামি। আমাদের পরিবারগুলোতে একটি মেয়ে শিশুকে স্বাবলম্বী করার চিন্তা নয়, বরং কীভাবে দ্রুত অন্যের ঘরে বিদায় করা যায় সেই চিন্তাই প্রধান। অনেক পরিবারে কন্যাকে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয় কেবল একটি ভালো পাত্র পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে। শিক্ষা যেখানে চেতনাকে মুক্ত করে, সেখানে নারীর শিক্ষা পরিণত হয়েছে বিয়ের বাজারের সস্তা অনুষঙ্গে। মেয়েরা পরের ঘরে চলে যাবে, তাই তাদের পেছনে বিনিয়োগ করে লাভ কী – এই মধ্যযুগীয় ভাবনাই বাল্যবিবাহের মূল চালিকাশক্তি। ছেলেকে ভবিষ্যতের আয়ের উৎস ভেবে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করা হলেও, মেয়েকে সেই সুযোগ না দিয়ে তাকে পরনির্ভরশীল করে রাখা হয়। এই দারিদ্র্যের চক্রটি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয় জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে চরম উদাসীনতায়। যে বেশকিছু পরিবার নিজেদের দারিদ্র্যের অজুহাতে কন্যাকে বোঝা ভাবে, তারাই আবার একের পর এক সন্তান জন্ম দেন আবার বলেন- মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি এই বলে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে সচল রাখছে। এই অন্ধকার বাস্তবতার পেছনে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নিরাপত্তাহীনতাও বড় কারণ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অভিভাবকেরা কন্যাকে ঘরের বাইরে পাঠাতে ভয় পান বখাটেদের উত্যক্তকরণ ও যৌন হয়রানির কারণে। তারা মনে করেন, দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিলে মেয়ের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু তারা বোঝেন না, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া তাকে আজীবন এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে দেওয়া। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। গ্রামীণ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতার অভাবে অপরিণত বয়সে আবেগতাড়িত সম্পর্ক তৈরি হয়, যা লোকলজ্জার ভয়ে তড়িঘড়ি করে বাল্যবিবাহে রূপ নেয়। এখানে ব্যর্থ আমাদের কাউন্সেলিং ব্যবস্থা ও নৈতিক শিক্ষা। বাংলাদেশের আইনে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর হলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, মা হওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযুক্ত বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর, যখন শরীর পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়। অথচ বরিশালের দুর্গম এলাকায় ১৪-১৫ বছরেই মেয়েদের বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া হয় এবং ১৮-১৯ বছর হওয়ার আগেই সে একাধিক সন্তানের মা হয়ে যায়। আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ। এই আইন অমান্যের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ভুয়া জন্মনিবন্ধন। একটি নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে, জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে ভুয়া অনলাইন জন্মনিবন্ধন কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু অপারেটরের যোগসাজশে রাতারাতি তার বয়স ১৮ বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি টিকে থাকে ঘুষের উপর। আইন প্রয়োগকারী, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তদবির ও অর্থের কাছে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিগুলো অসহায় হয়ে পড়ে। সবচেয়ে নির্মম পরিণতি নেমে আসে কিশোরীটির জীবনে। যে বয়সে তার বইয়ের পাতায় ডুবে থাকার কথা, সেই বয়সে অচেনা পরিবেশে পুরো সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে চাপে। শারীরিকভাবে তার নিজের শরীরই তখন বাড়ন্ত ও পুষ্টিহীন, ফলে অল্প বয়সে গর্ভধারণে সে অ্যানিমিয়া, প্রসবকালীন খিঁচুনি, ফিস্টুলার মতো চিরস্থায়ী রোগ এবং উচ্চ মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। তার সন্তানও জন্মায় মারাত্মক অপুষ্টি নিয়ে। মানসিক দিক থেকে যে নিজেই শিশু, তাকে আরেকটি শিশুর দায়িত্ব নিতে হয় বলে সে তীব্র মানসিক চাপ, শ্বশুরবাড়ির অবহেলা ও বিষণ্ণতায় নিজের আত্মবিশ্বাস চিরতরে হারিয়ে ফেলে। আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোও এই দুরবস্থার জন্য সমান দায়ী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে পড়াশোনা শেষ করেও মেয়েটি যখন ঘরে বসে থাকে, তখন পরিবার তাকে পুনরায় অলস বোঝা ভাবতে শুরু করে। যদি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কারিগরি শিক্ষা এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ ও অনুদান নিশ্চিত করা যেত, তবে এই মেয়েরাই পরিবারের অর্থনৈতিক স্তম্ভ হতে পারত। এই অসম বিয়েগুলোর স্থায়িত্বও খুব কম। যৌতুকের নির্যাতন ও পারিবারিক কলহে দ্রুতই ঘটে বিবাহবিচ্ছেদ। কিন্তু ট্র্যাজেডি এখানেই শেষ হয় না। ডিভোর্সে পর সমাজ মেয়েটির পাশে না দাঁড়িয়ে তাকেই দোষারোপ করে এবং পরিবার লোকলজ্জা ও দারিদ্র্যের অজুহাতে তাকে আবার দ্বিতীয় বিয়ের জন্য জোর করে। মেয়েটি যেন মানুষ নয়, কেবল এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হওয়া পণ্য। তাই কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগে এই ব্যাধি সারবে না, প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক গণজাগরণ। প্রথমত, ভুয়া জন্মনিবন্ধন ও ঘুষের সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় এনে আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। কন্যা সন্তানকে পরের আমানত ভাবার মজ্জাগত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সম্পত্তিতে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যা তাকে পরিবারে শক্ত অবস্থান দেবে। এই লড়াইয়ে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও যুবসমাজকে একসাথে কাজ করতে হবে এবং প্রতিটি গ্রামে বাল্যবিবাহ মুক্ত এলাকা গড়ার প্রত্যয় নিতে হবে। কন্যাকে বোঝা না ভেবে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। যেদিন একটি কন্যা শিশুর জন্মকে আশঙ্কার দীর্ঘশ্বাসে নয়, বরং একটি স্বাধীন ভবিষ্যৎ গড়ার আনন্দে বরণ করা হবে, সেদিনই আমাদের স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থ লাভ করবো এবং নারীজাতি অত্যাচার,অবহেলা,বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে।

লেখক: উপ- প্রচার সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।