সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীর হামলা: দায় কার, সমাধান কোথায়?”

Author

রনি মিয়া , গুরুদয়াল সরকারী কলেজ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৬৩ বার

সম্প্রতি বগুড়ার বিয়াম মডেল স্কুলে এক শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করার নির্মম ঘটনা দেশের সচেতন সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষকের প্রতি অসম্মান, সহপাঠীর ওপর নির্যাতন, সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হচ্ছে।  শির্ক্ষাথীর অপরাধের পর সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অনেক সময় মূল সমস্যাটি থেকে যায়। ফলে একই শিক্ষার্থী আবারও অপরাধে জড়ায়, অন্যরাও উৎসাহিত হয়। এভাবে অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজের স্বাভাবিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটও উপেক্ষা করার মতো নয়। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৯৪.০৫ লাখ; ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮৬.৩৮ লাখে। অর্থাৎ দুই বছরে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমেছে প্রায় ৭.৬৭ লাখ। এই হ্রাসের সবটুকু ঝরে পড়ার কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। তবে শিক্ষার্থীসংখ্যার এই পরিবর্তন মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।

প্রাথমিক শিক্ষার দুর্বল ভিত্তিও এ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে উঠেও মৌলিক গণিত, পাঠ অনুধাবন কিংবা নিজের ভাবনা লিখে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। বছরের পর বছর শেখার ঘাটতি নিয়ে এগোতে থাকা শিক্ষার্থীর কাছে একসময় পড়াশোনা অর্থহীন মনে হতে পারে। বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে, আত্মবিশ্বাস কমে এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ থেকে যথাযথ দিকনির্দেশনা না পেলে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ বন্ধুমহল কিংবা অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকতে পারে। অবশ্য কিশোর অপরাধের পেছনে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকসহ নানা কারণ কাজ করে; তাই এর দায় কেবল শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসংগত নয়।

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন শিক্ষার্থী গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থা তাকে কী দিচ্ছে? বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করলে সে কোথায় যাবে? শুধু শাস্তি দিলে তার আচরণ বদলানোর নিশ্চয়তা কোথায়? আবার পুনর্বাসনের কথা বলে অপরাধ উপেক্ষা করলে শিক্ষক, সহপাঠী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? আমার মতে, এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে একটি নতুন পথ তৈরি করা জরুরি। অপরাধের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের জন্য এমন একটি বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে তারা নতুনভাবে জীবন গড়ার সুযোগ পাবে।

১. প্রতি উপজেলায় বিশেষায়িত আবাসিক মডেল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা :

আমার প্রস্তাব, দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে বিশেষায়িত আবাসিক মডেল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। গুরুতর ও বারবার সংঘটিত সহিংসতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড কিংবা অন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে—এমন আচরণে জড়িত শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।

কোনো শিক্ষার্থী সাধারণ বিদ্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে গুরুতর অপরাধমূলক আচরণ করলে এবং প্রচলিত ব্যবস্থায় তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে, তাকে এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিকে একমাত্র শর্ত করা যাবে না। কারণ, অভিভাবক অসম্মতি জানালেই যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে গুরুতর অপরাধে জড়িত কিছু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত যথাযথ তদন্ত, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হতে হবে; শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের বক্তব্য শোনা এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগও থাকতে হবে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার দায়িত্ব বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা ও শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।  এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং বিভিন্ন ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও যোগ্যতা শনাক্ত করে তার সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িয়েছে বলেই তার সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। সঠিক পরিবেশ, কঠোর শৃঙ্খলা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে তার জীবনের গতিপথ বদলানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এই বিশেষ বিদ্যালয় কোনো সাধারণ আবাসিক স্কুলের বিকল্প নয়; এটি হবে গুরুতর আচরণগত ও অপরাধমূলক সমস্যায় জড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পৃথক ব্যবস্থা। এর বিস্তারিত পরিচালনাপদ্ধতি, জনবল, ব্যয় ও মূল্যায়নব্যবস্থা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আলোচনা এখনই শুরু হওয়া প্রয়োজন।

 

২. বয়সের পাশাপাশি অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় আইন সংস্কার

কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় আইনগত দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে কোনো অপরাধের গুরুত্ব যেন আড়ালে চলে না যায়। একই সঙ্গে বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনা না করে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীর মতো একই ব্যবস্থা গ্রহণ করাও যথাযথ নয়। প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো, যেখানে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশি আইনে ১৮ বছর পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই বয়সভিত্তিক দায়বদ্ধতার কাঠামোয় পরিবর্তনের আলোচনা বর্তমান আইনের বর্ণনা নয়, বরং আইন সংস্কারের প্রস্তাব। ১৩ বছরের নিচে শিশু এবং ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী ভিন্ন মাত্রার জবাবদিহির ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এমন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বয়স, মানসিক পরিপক্বতা, ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।এখানে মূল বক্তব্য একটাই—কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা যেন বাস্তব হয়, অপরাধের শিকার ব্যক্তি যেন ন্যায়বিচার পান এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরের সামনে নিজেকে সংশোধন করার পথও খোলা থাকে।

এছাড়া মাধ্যমিক  বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করা , মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার বন্ধ করা , মাদকচক্র দমন ও পরিবারের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে  ।

শেষ কথা ,  বহিষ্কার, সাময়িক শাস্তি কিংবা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর শৃঙ্খলা, অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী জবাবদিহি, মাদকচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষার পথ। এই সমন্বিত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে প্রতি উপজেলায় বিশেষায়িত আবাসিক মডেল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। প্রচলিত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিকল্প আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা ও কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো নিয়ে সরকারকে এখনই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। কারণ, সমস্যাকে উপেক্ষা করে নয়, বরং কঠোরতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে একটি কার্যকর পথ তৈরি করেই এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

লেখক: সাধারন সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক আলোকিত সকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।