রজনীকান্ত সেন: অমর কবির উপেক্ষিত স্মৃতি
https://epaper.bd-bulletin.com/share.php?q=2026/07/26/4/details/4_r4_c3.jpg
রজনীকান্ত সেন: অমর কবির উপেক্ষিত স্মৃতি
আজ ২৬ জুলাই। কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের ১৬১ তম জন্মবার্ষিকী। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের পরিসরে তিনি এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার গান ও কবিতা আজও মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে অনুরণিত হয়। তাঁর গান কেবল সুরের মাধুর্যেই নয়, বরং ভক্তি, মানবপ্রেম, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও বিধাতায় আত্মসমর্পণের গভীর বাণীতে যুগে যুগে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো- যে কবির গান আজও বাঙালির কণ্ঠে বেঁচে আছে, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থাপনা আজ অবহেলা, দখল ও বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে তাঁর স্বহস্তে নির্মিত ‘আনন্দ নিকেতন’ বর্তমান অবস্থা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবির অন্যতম রজনীকান্ত সেন সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনবোধ প্রকাশের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন আধ্যাত্মিকতার নির্মল ধারা প্রবাহিত হয়েছে, তেমনি দেশপ্রেম, নীতিবোধ ও মানবিক মূল্যবোধও সমান তরঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ২৯০। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু সাহিত্যকর্ম বিস্মৃত হলেও রজনীকান্তের গান আজও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, দেশাত্মবোধক পরিবেশনা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চার অংশ হয়ে আছে। ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার) ভাঙাবাড়ি গ্রামে সম্ভ্রান্ত বৈদ্যবংশে তাঁর জন্ম। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সাব-জজ এবং বৈষ্ণবধর্মের অনুরাগী; মাতা মনোমোহিনী দেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণা ও সংস্কৃতিমনা। পারিবারিক এই পরিবেশেই রজনীকান্তের সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। রাজশাহীতে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করে পরে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বি.এ. এবং পরবর্তীকালে বি.এল. ডিগ্রি অর্জন করেন। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল সাহিত্যসাধক হিসেবে। রাজশাহীর দিনগুলোই তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ওকালতির পাশাপাশি তিনি কবিতা ও গান রচনায় নিমগ্ন থাকতেন, সাহিত্যসভায় অংশ নিতেন এবং ধীরে ধীরে সাহিত্যাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন। প্রচারবিমুখ এই কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতা ছিল ‘আশা’, যা বন্ধুদের উৎসাহে একটি মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। রজনীকান্তের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আন্তরিকতা। তিনি কৃত্রিম অলংকারে বিশ্বাসী ছিলেন না; সাধারণ মানুষের ভাষায় অসাধারণ অনুভূতি প্রকাশ তিনি ঘটাতে পারতেন। এ কারণেই তাঁর গান ও কবিতা শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছেও সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একে একে বহু প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। বিশেষ করে তৃতীয় পুত্র ভূপেন্দ্রনাথের মৃত্যু তাঁর হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল, তার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর বহু এই সংগীতে। সেই গভীর আত্মসমর্পণের অনুভূতি থেকেই তিনি লিখেছিলেন—
“তোমারই দেওয়া প্রাণে, তোমারই দেওয়া দুখ,
তোমারই দেওয়া বুকে, তোমারই অনুভব।”
শুধু ভক্তিমূলক গানই নয়, দেশপ্রেমমূলক সঙ্গীত রচনায়ও তিনি ছিলেন সমান নিবেদিতপ্রাণ । বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়’ গানটি সাধারণ মানুষকে স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর রচনায় দেশপ্রেম কখনো উচ্চকণ্ঠের স্লোগান হয়ে ওঠেনি; বরং আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। রজনীকান্ত সেনের সাহিত্যভাণ্ডারও ছিল সমৃদ্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাণী’, ‘কল্যাণী’, ‘অমৃত’, ‘আনন্দময়ী’, ‘বিশ্রাম’, ‘অভয়া’, ‘সদ্ভাব-কুসুম’ এবং ‘শেষদান’। পরবর্তীকালে তাঁর সমগ্র রচনা ‘রজনীকান্ত কাব্যগুচ্ছ’ নামে সংকলিত হয়। তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে পণ্ডিত নলিনীরঞ্জন পণ্ডিতের ‘কান্তকবি রজনীকান্ত’ গ্রন্থটি এখনও অন্যতম প্রামাণ্য জীবনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস,যে মানুষ তাঁর সৃষ্টি সাহিত্য দিয়ে লক্ষ মানুষের হৃদয়ে গভীর বোধের আলৈাড়ন তুলেছিলেন, তাঁর নিজের জীবন শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে সংগ্রাম, অসুস্থতা এবং অর্থকষ্টের এক মর্মস্পর্শী ইতিহাস। জীবনের শেষ অধ্যায়ে রজনীকান্ত সেনকে লড়তে হয় এক কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। ১৩১৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাসে তাঁর গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। সে সময় চিকিৎসাবিজ্ঞান এতটা উন্নত ছিল না। বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও রোগের স্থায়ী উপশম মেলেনি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতা মেডিকেল কলেজের একটি কটেজে ভর্তি করা হয়। অসুস্থতা ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তখন মনের ভাব তিনি কাগজে লিখে প্রকাশ করতেন। এই দুঃসময়ে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন সমকালীন বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ছিলেন। কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল চরম আর্থিক সংকটের। চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি তাঁর ‘বাণী’ ও ‘কল্যাণী’ গ্রন্থের স্বত্ব মাত্র চারশত টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে কাশিমবাজারের মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীসহ অনেক শুভানুধ্যায়ী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত সকল প্রচেষ্টা বিফলে যায়। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। এখন জিজ্ঞেসা হলো আমরা কি সত্যিই রজনীকান্ত সেনকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি? রাজশাহীতে তিনি ‘আনন্দ নিকেতন’ নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি এই বাড়িতেই কাটিয়েছেন। এই বাড়িতেই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর বহু অমর গান ও কবিতা। এটি শুধু একটি বসতভিটা নয়; বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। দুঃখজনক হলেও সত্য, কবির মৃত্যুর পর এবং দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর পরিবার অন্যত্র চলে গেলে ‘আনন্দ নিকেতন’ ধীরে ধীরে অবহেলিত হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটির একটি বড় অংশ দখল হয়ে যায়। বর্তমানে ভগ্নপ্রায় কয়েকটি দেয়াল, কিছু ইট-পাথরের স্তম্ভ এবং স্মৃতির ক্ষীণ চিহ্নই অতীতের গৌরবের সাক্ষ্য বহন করছে। আজ সেখানে নীরবতা ও অবহেলাই যেন প্রধান বাস্তবতা। সরকারি উদ্যোগের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থানটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কবির নামাঙ্কিত একটি ছোট্ট সড়ক ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম চোখে পড়ে না। তবে স্থানীয় উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে জনহিতৈষী অ্যাডভোকেট ছানোয়ার হোসেন তালুকদারের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রজনীকান্ত স্মৃতি রজনী সংসদ ও পাঠাগার’। সেখানে নির্মিত হয়েছে ‘রজনী মুক্তমঞ্চ’। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে ‘কবি রজনীকান্ত স্মৃতি সার্বজনীন পূজামন্দির’। এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও একজন জাতীয় কবির স্মৃতিকে সংরক্ষণের জন্য তা যথেষ্ট নয়। তাঁর মূল বাড়ি, পুকুর ও আঙিনা এখনও সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত নয়। এই বাস্তবতা আমাদের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি শুধু কবিদের জন্মদিন পালন, স্মরণসভা আয়োজন কিংবা তাঁদের গান গাওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ বলে মনে করি? নাকি তাঁদের জীবন, কর্ম এবং স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্বের অংশ? বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের সাহিত্যিকদের বাসভবন, কর্মস্থল ও স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করে। সেগুলো গবেষণা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অথচ আমাদের দেশে বহু গুণীজনের স্মৃতিচিহ্ন এখনও অবহেলিত। রজনীকান্ত সেনের ‘আনন্দ নিকেতন’ সেই অবহেলার অন্যতম উদাহরণ। অতএব, এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ‘আনন্দ নিকেতন’কে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। বাড়িটি পুনরুদ্ধার করে সেখানে একটি গবেষণা ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু রজনীকান্তের সাহিত্য নয়, তাঁর জীবনসংগ্রাম সম্পর্কেও জানার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তাঁর গান, ব্যক্তিগত স্মারক ও জীবনভিত্তিক তথ্য ডিজিটাল সংরক্ষণের উদ্যোগও সময়ের দাবি। আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতিও রয়েছে বিশেষ আহ্বান। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে পাঠাভ্যাস কমছে, অথচ রজনীকান্তের সাহিত্য আজও মানবিকতা, নৈতিকতা, আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের অনন্য শিক্ষা দেয়। তাই তাঁর গান, কবিতা ও ভাবধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং তরুণ লেখক-পাঠকদের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ, সাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের পথও দেখায়। আজ ২৬ জুলাই, কান্তকবি রজনীকান্ত সেনের ১৬১তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় শুধু আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়; তাঁর সৃষ্টির পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিচিহ্নও সংরক্ষণ করা। যে কবির গান একদিন মানুষের হৃদয়ে আশা, ভক্তি ও দেশপ্রেমের আলো জ্বালিয়েছিল, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ‘আনন্দ নিকেতন’ যেন আর অবহেলা ও বিস্মৃতির প্রতীক হয়ে না থাকে। কারণ, কোনো জাতি তার মহান সাহিত্যিকদের কেবল রচনার মধ্যেই নয়, তাঁদের স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষণের মধ্য দিয়েও সম্মান জানায়। রজনীকান্ত সেনের সাহিত্য যেমন অমর, তেমনি তাঁর স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণও আজ আমাদের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসের কাছে এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।
তথ্যসূএ: রজনীকান্ত কাব্যগুচ্ছ (সাহিত্য সংসদ), কান্তকবি রজনীকান্ত (নলিনীরঞ্জন পন্ডিত)
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
