‘ শ্রমজীবী মানুষের একাল ও সেকাল ‘ নিয়ে তারুণ্যের ভাবনা।
মে এমন একটি মাস যার সাথে মিশে আছে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সম্মান ও সংগ্ৰামের গল্প। মিশে আছে রক্তাক্ত ইতিহাসের গল্পকথা ও আত্মত্যাগ। যার সূচনা হয়েছিল শিকাগো শহরের একঝাঁক বিপ্লবী শ্রমিকের বিপ্লবী চিন্তা চেতনার মধ্যে দিয়ে। যাদের দাবি ছিল – নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায় মজুরি এবং আট ঘণ্টা কর্মদিবস। সময় পরিবর্তন হয়েছে, পৃথিবী শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে প্রযুক্তি বিপ্লবের দেখা পেয়েছে। তবু শ্রমজীবী মানুষের একাল ও সেকালের গল্প আজও হয়তো অপরিবর্তিত। এরই ধারাবাহিকতায় ‘ শ্রমজীবী মানুষের একাল ও সেকাল ‘ নিয়ে তারুণ্যের ভাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহসানা হাবিবা অরনা।
কালপরিবর্তনের ধারায় শ্রমজীবী মানুষ:
শ্রমজীবী মানুষ সমাজের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলেও অতীতে তাদের জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রম ও বঞ্চনায় ভরা। দীর্ঘ সময় কাজ করেও তারা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। বর্তমান সময়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে । ১লা মে “আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস” হিসেবে বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ পালিত হচ্ছে। এই দিবস শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রতীক। তবুও বাস্তবতা হলো, এখনো অনেক শ্রমজীবী মানুষ সমান সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
আমার মতে, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা শুধু স্বীকৃতিতেই নয়, বাস্তবে নিশ্চিত করা জরুরি।
স্মিথ জাহান বিভা
ইংরেজি বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ,কুষ্টিয়া ।
শ্রমিকের জীবন যাত্রার মান:
সভ্যতা বিনির্মাণে শ্রমিকদের অবদান অতুলনীয়। তবে তারাই আজ সবচেয়ে অবহেলিত, নানা সমস্যায় জর্জিত। জীবনযাত্রার মান এদেশে অনেকটাই অনুন্নত। অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন, তাদের উপার্জন অনির্দিষ্ট। বিবিএস এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে এই খাতেই ৮৫% শ্রমিক জড়িত। যেখানে পোশাক খাতে শ্রম দেয় ৬০% বেশি নারী। অথচ তাদের বেতন অনেক কম। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪.২ শতাংশ নারী, তবে ২০২৩ সালের তুলনায় কর্মজীবী নারীর সংখ্যা কমেছে। যা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অশনি সংকেত। সবচেয়ে করুণ অবস্থায় পতিত চা শ্রমিকগণ। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৭৪% শ্রমিক দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস। তাদের প্রতিদিনের আয় প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু সামগ্রিক চিত্র এটায়। কিন্তু দেশের মুদ্রাস্ফীতি যে কম, তা নয়। বরং ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর মূল্যও দিনে দিনে বাড়ছে। জ্বালানী সংকট, অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুতদারিসহ বিভিন্ন কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর জন্য দায়ী। ফলস্বরূপ, স্বল্প আয় বা বেতনে প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করা শ্রমিকদের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব। তাই যেমন বৃদ্ধি হচ্ছে দারিদ্র্য, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। তৈরি হচ্ছে শ্রেণিদ্বন্দ্ব। তাই সামগ্রিক বিবেচনায় সরকারকে নির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক এবং নীতিমালা গঠন করতে হবে। শক্ত হাতে দমন করতে মজুতদারি, দুর্নীতি। কমাতে হবে মুদ্রাস্ফীতি। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিতে হবে মানানসই উদ্যোগ। মৌলিক অধিকার এবং সমতা আনয়নে এই পদক্ষেপ বাঞ্ছনীয়।
আশিকুর রহমান,
শিক্ষার্থী, আল-ফিকহ্ এন্ড ল বিভাগ,
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
শ্রমিকের জীবন:বাস্তবতার আয়না
কষ্টের আড়ালে এক অদম্য শক্তি নিয়ে শ্রমজীবীরা প্রতিনিয়ত দেশের উন্নয়নের চাকা বদলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু অপরিবর্তিত রয়ে গেছে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য। সেকাল ও একালের মধ্যে কিছুটা স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। একালে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনে সুফল বয়ে এনেছে।শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কাজের ক্ষেত্র বেড়েছে। এখন বিভিন্ন কারখানা, নির্মাণশিল্প, পরিবহন ও সেবা খাতে অসংখ্য শ্রমিক কাজ করছেন অপরদিকে সেকালে ছিল না উন্নত প্রযুক্তি,শিক্ষা ও পর্যাপ্ত কাজের বিস্তৃতি ।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৈহিক পরিশ্রমের উপর নির্ভরশীল ছিল। তবুও সেকালে ছিল তাদের মাঝে এক স্বস্তির আভাস। অল্প আয়েই তাদের পুরো মাস কেটে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে আয়ের ধরন কিছুটা পরিবর্তন হলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় পুরো মাস চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। শ্রমিকদের অধিকার পূর্বের তুলনায় কিছুটা স্বীকৃতি পেলেও এখনও অনিরাপদ পরিবেশ,অন্যায্য মজুরি ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার শিকার হতে হয়। সেকালে বিভিন্ন শ্রেনীর শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ভেদাভেদের প্রবণতা দেখা গিয়েছে এর ফলে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের মাঝে হীনমন্যতার জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার প্রয়াসে কিছুটা নিরসন ঘটলেও এটি যথেষ্ট নয়। সবশেষে বলা যায়, সেকাল থেকে একাল সময়ের পরিবর্তনের সাথে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে কিছু উন্নতি এলেও, তাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। একটি ন্যায্য ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে, শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও সকল শ্রমজীবী মানুষদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।
শিলা আক্তার
শিক্ষার্থী, ল এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ।
আজন্ম অপরিবর্তিত মেহনতি মানুষের ভাগ্য :
আজ থেকে প্রায় ১৩৬ বছর আগে আমেরিকান শিকাগোর হে মার্কেটে একদল শ্রমিকের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মেহনতি মানুষের শ্রমের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। মাঝখানে প্রায় ১২ যুগ পেরিয়ে গেলেও তাদের ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে নি। যেই কৃষকের সারাদিনের হার ভাঙ্গা পরিশ্রমে সকলের অন্ন জোটে। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা তার শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে না। যেই নির্মাণ শ্রমিকের রক্ত ঘামে সুউচ্চ দালান নির্মিত হয় দিন শেষে তাকে বস্তিতেই রাত্রি যাপন করতে হয়। বিশেষত আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে মেহনতি মানুষের জীবন ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। যেখানে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলেও শ্রমিকের মুজুরি অপরিবর্তিত থাকে। সরকারিভাবে বাস ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও একজন রিকশাচালকের রিকশা ভাড়া কখনো বাড়ে না। একজন কৃষক এক মন ধান বিক্রি করে এক কেজি ইলিশ কিনতে পারে না। একজন খামারি হয়তো সকলের দুধের চাহিদা মেটালেও খোদ নিজের পরিবারই পুষ্টিহীনতায় ভোগে। কাজেই শুধুমাত্র বাৎসরিক মে দিবস পালনের মাধ্যমে শ্রমিকের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটবে না। মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারের সু পরিকল্পনার পাশাপাশি মালিক পক্ষের যথাযথ আন্তরিকতা প্রয়োজন।
নাসির বাবু
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
সমাজব্যবস্থার চোখে শ্রমজীবী:
আমাদের সমাজে যারা পরিশ্রম করে, আমাদের অন্ন বস্ত্রের জন্য যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা বরাবরের মতোই সর্বদা অবহেলিত, অবমূল্যায়িত ও অমর্যাদার শিকার। অথচ সমাজ বিনির্মাণ ও দেশের বিনির্মাণে এসব মেহনতি শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য একাল থেকে সেকাল সব সময়েই এই সমাজের অধিকাংশ মানুষই অহংকার ও দাম্ভিকতায় এসব শ্রমজীবী মানুষদের অবজ্ঞা দেখিয়ে আসছে। তারা মানুষের অবস্থানকে ভালোবাসে, অবস্থানকে মূল্যায়ন করে । অথচ যারা পরিশ্রম করে সভ্যতার বিনির্মাণ করছে তাদেরকে অবমূল্যায়ন করে চলেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা সেদিনই উত্তম মানুষ হবো যেদিন শ্রমজীবী মানুষদেরকে আপন পরিবারের কেউ একজন ভাবতে পারবো, তাদের সাথে মিশতে পারবো, তোদের সাথে বসে খাবার ভাগাভাগি করে খেতে পারব সেদিন মূলত আমরা প্রকৃত মানুষ হবো। এজন্য শ্রমজীবীদের জন্য সরকার ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। জরুরি তাদের ন্যায মজুরি নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রদান করা। শ্রমিকদেরকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভাবে যথাযথ মর্যাদা প্রদান করা। প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদেরকে মেহনতি মানুষকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।
আব্দুল হালিম হাম্মাদ
শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
