বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন
হোম / ফিচার / নিবন্ধ

জীবিকা যখন শৈশবকে গ্রাস করে

Author

স্নেহা ফেরদৌস মীম , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ পাঠ: ৫ বার

 

একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই, রঙ পেন্সিল কিংবা প্রিয় খেলনাটি। তার সকাল শুরু হওয়ার কথা ছিল বিদ্যালয়ের ঘণ্টাধ্বনি কিংবা নতুন কিছু শেখার আনন্দে। অথচ বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর হাতে আজ বইয়ের পরিবর্তে শ্রমের ভার, স্বপ্নের পরিবর্তে দায়িত্বের বোঝা। যে বয়সে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সে বয়সেই তারা জীবিকার কঠিন সংগ্রামে নেমে পড়ছে। শিশুশ্রমের এই বাস্তবতা কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি মানবতা, ন্যায়বিচার এবং সভ্যতার জন্য এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

 

প্রতিবছর ১২ জুন পালিত হয় শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস। দিবসটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি শিশুর শৈশব, শিক্ষা ও নিরাপদ জীবনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও অসংখ্য শিশু চায়ের দোকান, গ্যারেজ, ইটভাটা, কারখানা, নির্মাণশ্রম কিংবা গৃহকর্মে নিয়োজিত। তাদের অনেকেই জানে না শৈশব কাকে বলে, জানে না ছুটির দিনের উচ্ছাস কিংবা অবসরে গল্পের বই পড়ার আনন্দ।

 

শিশুশ্রমের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দারিদ্র্য। যখন একটি পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়, তখন শিশুর উপার্জনও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের চেয়ে পেটের ক্ষুধাকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়।না দিয়েই বা উপায় কি পেটে ক্ষুধা থাকলে পূর্ণিমার চাঁদটাকেও ঝলসানো রুটি মনে হয়। আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে আগে খাদ্য এরপর বস্ত্র তারপর শিক্ষা। খাদ্যের চাহিদাই যেখানে ঠিকঠাক পূরণ হয় না সেখানে শিক্ষা তাদের জন্য বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।ফলে শিশুরা বিদ্যালয় ছেড়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রকে আরও শক্তিশালী করে। কারণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত একটি শিশু ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ হারায়।

 

শিশুশ্রমের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এর শারীরিক ও মানসিক প্রভাব। দীর্ঘ সময় কাজ, অনিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং কখনো কখনো নির্যাতন।সব মিলিয়ে একটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া হয় ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে। সমাজ অনেক সময় এই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা সমস্যাটিকে আরও স্থায়ী করে তোলে।

 

প্রশ্ন হলো,শিশুশ্রম কি শুধু আইন দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব? বাস্তবতা বলছে, না। আইন প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন কার্যকর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত করা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এসব উদ্যোগ একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। কোনো শিশুকে শ্রম করতে দেখলে সেটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। আজ যে শিশু কর্মক্ষেত্রে ঘাম ঝরাচ্ছে, সে-ই আগামী দিনের নাগরিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হতে পারত। কিন্তু আমরা যদি তার শৈশবই রক্ষা করতে না পারি, তাহলে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যান একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উঁচু অট্টালিকা নয়; বরং একটি সমাজ তার শিশুদের কতটা নিরাপদ, শিক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে পারছে, সেটিই প্রকৃত অগ্রগতির পরিচয়।

 

শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্ব দিবস তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পালন নয়; এটি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করার দিন। আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করি, যেখানে কোনো শিশুকে জীবিকার জন্য শৈশব বিসর্জন দিতে হবে না; যেখানে প্রতিটি শিশুর হাতে থাকবে বই, চোখে থাকবে স্বপ্ন, আর সামনে থাকবে সম্ভাবনাময় এক ভবিষ্যৎ। কারণ শিশুরা শ্রমিক নয়, তারা আগামী দিনের বাংলাদেশ।

লেখক: N/A, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!