দাও ফিরে সে অরণ্য, লাও এ নগর—বৃক্ষ দিবসে হোক এই অঙ্গিকার।
দাও ফিরে সে অরণ্য, লাও এ নগর—বৃক্ষ দিবসে হোক এই অঙ্গিকার।
মোছাঃ মিথিলা খাতুন।
বৃক্ষ মানবজাতির পরম বন্ধু, প্রকৃতির এক অমূল্য দান। নিঃস্বার্থভাবে তারা আমাদের ছায়া, অক্সিজেন, কাঠ, ফলসহ নানান উপকারিতা প্রদান করে। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত নির্বিচারে বন উজাড় করছি। মানুষের উন্নয়নের নামে বৃক্ষনিধনের এই প্রবণতা আজ ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। “দাও ফিরে সে অরণ্য, লাও এ নগর”— বহু বছর আগে কবির এই আহ্বান আজ আমাদের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, কৃষিজমি সম্প্রসারণ ও বন উজাড়ের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১৩ সালের ২১ মার্চ, প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বন দিবস পালিত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বনের সহ অন্যান্য গাছের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
২০২৫ সালের ২১ মার্চ, বিশ্ব বন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো “বন এবং খাদ্য”, যা খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও জীবিকার ক্ষেত্রে বনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে। বন কেবল খাদ্যের উৎস নয়, এটি জ্বালানি, কর্মসংস্থান, সুস্থ মাটির ভারসাম্য রক্ষা ও পানির উৎস সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বনভূমির পরিমাণ ১৭.৫%, তবে FAO এর মতে, এই হার মাত্র ১০%। একটি দেশের আয়তনের তুলনায় বন থাকা প্রয়োজন, তবে বাংলাদেশে এই হার বিপজ্জনকভাবে কম, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
বন ধ্বংসের ফলে শুধু স্থানীয় পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরও একটি বড় কারণ। গবেষণা অনুযায়ী, বন উজাড়ের ফলে প্রতি বছর প্রায় ১.৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যোগ হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। বনভূমি পৃথিবীর মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ৩০% শোষণ করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, বন উজাড়ের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, পানির চক্র ব্যাহত হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু বন উজাড়ের ফলে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, যদি বন ধ্বংসের এই গতি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী ১০০ বছরে পৃথিবীর প্রায় ৪০% বনভূমি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। তাই, বন সংরক্ষণ শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলার জন্যও অপরিহার্য।
বন ধ্বংসের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বন রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন বন্ধ, সামাজিক বনায়ন বৃদ্ধি, বন সংরক্ষণ বিষয়ক কঠোর আইন বাস্তবায়ন, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
বন ধ্বংসের প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। বন উজাড়ের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যায়, পানির উৎস শুকিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ে। সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বাঁধ হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এই বনও আজ হুমকির মুখে। বন ধ্বংসের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
বন সংরক্ষণের জন্য আমাদের প্রথম প্রয়োজন সচেতনতা। প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে যে বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন ছাড়া আমরা অক্সিজেন, খাদ্য, পানির মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারব না। তাই বন সংরক্ষণের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বন সংরক্ষণ বিষয়ক কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বন সংরক্ষণের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বন উজাড়কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণের কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় জনগণ যদি বন থেকে উপকৃত হয়, তারা নিজেই বন রক্ষায় এগিয়ে আসবে।
তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। নগরায়নের নামে যেভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণে সবুজ স্থান রাখা, পার্ক ও উদ্যান তৈরি করা এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর মাধ্যমে নগর জীবনে বনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
চতুর্থত, বন সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গোটা বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তাই এই সমস্যা মোকাবিলায় সব দেশকে একসাথে কাজ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর উচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বন সংরক্ষণের জন্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা।
বন সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্ব। আমরা যদি আজই সচেতন না হই, তাহলে আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা একটি বিপন্ন পৃথিবীর মুখোমুখি হবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে বন সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে আসি। প্রতিটি মানুষ যদি একটি করে গাছ লাগায় এবং তা রক্ষা করে, তাহলেই আমরা আমাদের পৃথিবীকে বাঁচাতে পারব। “দাও ফিরে সে অরণ্য, লাও এ নগর”— এই আহ্বানকে বাস্তবায়িত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

