শনিবার, ৯ মে ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মাস্টার্স প্রিলি পাসে অনার্সের মর্যাদা চাই

Author

আরিফুল কাদের , চট্টগ্রাম কলেজ

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৫ পাঠ: ৫৭ বার

মাস্টার্স প্রিলিতেই অনার্সের মর্যাদা চাই।

আরিফুল কাদের

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল প্রচলিত দুটি কোর্স হলো অনার্স (সম্মান) ও ডিগ্রি (পাস কোর্স)। বর্তমানে অনার্স পাস করে অল্পকিছু চাকরি বাদে ১ম শ্রেণি থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের চাকরিতে আবেদন করা যায়। অনার্স ৪ বছর মেয়াদী এবং ডিগ্রি পার্স কোর্স ৩ বছর মেয়াদী কোর্স যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালযের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে।

ডিগ্রি (পাস কোর্স) সম্পন্ন করে বিসিএসসহ  প্রথম শ্রেণির কোনো চাকরিতে আবেদন করা যায় না। পাশাপাশি বিভিন্ন চাকরির বিষয়ে আরো বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যা ডিগ্রিধারীদের নানাভাবে হতাশ করছে প্রতিনিয়ত।

অনার্সে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে অনেকে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়। ডিগ্রিতে তুলনামূলকভাবে চাপ কম। তাছাড়া ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস কোর্সে তেমন ক্লাসও করতে হয় না। পড়ার চাপ কম থাকায় অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ছোটখাটো চাকরি করে নিজের খরচ বহন করে কিংবা পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে থাকে। অনেকে আবার দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশ করার জন্য ৪ বছর মেয়াদী অনার্সে ভর্তি না হয়ে ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হয়। কেননা আপাতত দৃষ্টিতে মনে হয় ৩ বছর মেয়াদী কোর্স হওয়ায় তারা অনার্সধারীদের ১ বছর আগেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অনার্সের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চললেও ডিগ্রি পাস কোর্সের শিক্ষার্থীরা চরম বৈষম্যের শিকার৷ ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস কোর্স শেষ হতে সময় লাগে ৫-৬ বছর বা তারও বেশি। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে ডিগ্রি পাস কোর্স এমন একটি কোর্স যেখানে ১৮ মাসে বছর গণনা হয়৷ ৩ বছর মেয়াদী কোর্স ৫-৬ বছরে শেষ করলেও ডিগ্রি পড়ুয়াদের হতাশার শেষ নেই। কারণ ডিগ্রি পাসে ১ম শ্রেণি এমনকি ২য় শ্রেণির চাকরিতেও আবেদন করা যায় না। ডিগ্রি শেষ করে ২ বছর মেয়াদী মাস্টার্স শেষ করে তারপর অনার্স মাস্টার্সের সমান যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

একদিকে সেশনজট, অপরদিকে অযোগ্যতা। দুটো মিলিয়ে চাকরির বাজারে সবদিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ে ডিগ্রি পড়ুয়ারা। পারিবারিক চাপ, দুশ্চিন্তা সব মিলিয়ে চাকরি প্রত্যাশীদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে পড়ালেখার প্রবণতা কমে আসে। অনার্সধারীরা ডিগ্রি পড়ুয়াদের আগেই চাকরির প্রতিযোগিতায় নেমে যায়। সার্টিফিকেট সীমাবদ্ধতার কারণে ডিগ্রি পড়ুয়ারা পিছিয়ে পড়ে।

৩ বছর মেয়াদী পাস কোর্স সম্পন্ন করে আবার ২ বছর মেয়াদী মাস্টার্স করতে হয়। ২ বছর মেয়াদী মাস্টার্স শেষ করতে সময় লেগে যায় আরো প্রায় ৩ বছর মতো। ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি কোর্স শেষ করতে ৫-৬ বছর, ২ বছরের মাস্টার্স শেষ করতে ৩ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। দিনশেষে দেখা যায় ততদিনে একজন শিক্ষার্থী প্রায় তার শেষ বয়সে চলে আসে। চাকরি করবে কিংবা চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার মতো তেমন সময় তার হাতে অবশিষ্ট থাকে না। সর্বোচ্চ ১/২ বছর পর্যন্ত সময় থাকে। যা তাদের আরো বেশি হতাশায় নিমজ্জিত করে ফেলে। এর ফলে প্রতি বছর দেশে হু হু করে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

একদিকে চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতা, সমাজের খোঁটা, অপরদিকে বয়সের শেষ প্রান্তে উপনীত হওয়া। সবকিছু মিলে ডিগ্রি পার্স কোর্সের শিক্ষার্থীরা দিনদিন চরম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। অনেকে আবার আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছে। অথচ কর্তৃপক্ষের এব্যাপারে কোনো খবর নেই। তারা বরাবরই এসব বিষয়ে উদাসীন। বিভিন্ন কলেজের প্রতিনিধিরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলেও শুধু আশ্বাসই পেয়েছেন। আশানুরুপ ফল কখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত এখনই এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এর কুফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

এ সমস্যা নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট কোর্স নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করে দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। সেশনজট কমিয়ে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে হবে। বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স চালু করতে হবে। পাশাপাশি ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করে তার সাথে ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স প্রিলিকে সংযুক্ত করে ৪ বছর মেয়াদী সার্টিফিকেট দেওয়া যেতে পারে, যার মান হবে অনার্সের সমান। পরবর্তী ১ বছর হবে মাস্টার্স সার্টিফিকেটের জন্য। যার মান হবে মাস্টার্সের সমান। ডিগ্রি পড়ুয়াদের মাস্টার্স পর্যন্ত পড়তে গিয়ে সময় লাগছে অনার্সের প্রায় দ্বিগুণ। মনে রাখতে হবে একজন শিক্ষার্থী যত বেশি যোগ্যতা সম্পন্ন হবে তত বেশি সমাজ, দেশ, তথা জাতির উপকার হবে। ডিগ্রি পড়ুয়াদের চাকরির বাজারে টিকিয়ে রাখতে ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স প্রিলির পর তাদের অনার্সের সমান মর্যাদা দেওয়া মোটেও অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। অনার্স ৪ মেয়াদী। অপরদিকে ডিগ্রি ও মাস্টার্স প্রিলি মিলে ৩+১= ৪ বছর হয়ে যায়। পরবর্তী ১ বছরকে মাস্টার্স হিসাব করে সার্টিফিকেট দিতে হবে। সার্টিফিকেটে ধরা বাধা থাকতে হবে এমন না। চাইলে ডিগ্রি, মাস্টার্স সবগুলো আলাদা সার্টিফিকেট দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি পাস কোর্স শেষ করার পর ১ বছর মেয়াদী মাস্টার্স প্রিলি শেষ হলে এই ৪ বছর মেয়াদকে অবশ্যই অনার্সের সমমর্যাদা দিয়ে স্বীকৃতি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে সার্টিফিকেট দ্বৈতভাবে দেওয়া হোক, কিংবা আলাদাভাবে দেওয়া হোক। বছরের পর বছর ধরে চলমান ডিগ্রি বৈষম্য নিরসনে এমন সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। বৈষম্য নিরসন, ডিগ্রি পড়ুয়াদের চাকরির বাজারে টিকিয়ে রাখা, দেশে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনার জন্য মাস্টার্স প্রিলির পর ডিগ্রিধারীদের অনার্সের মর্যাদা দিতে হবে। এতে করে তারা বিসিএস থেকে শুরু করে দেশের ১ম সারির সকল চাকরিতে অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতা করতে পারবে। নিজ যোগ্যতায় তারা দেশ, জাতির কল্যাণে অবদান রাখতে পারবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আকুল আবেদন, বিষয়গুলো যথাযথ বিবেচনার মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক এবং ডিগ্রি পড়ুয়াদের মাস্টার্স প্রিলিতেই অনার্সের মর্যাদা দেওয়া হোক।

 

 

লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!