মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ফলাফল বিপর্যয় নাকি শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র?

Author

মোঃ রুহুল আমিন , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ পাঠ: ১২৬ বার

২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই গোটা দেশে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়। পাসের হার কমে যাওয়া, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়া এবং বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া সমাজের সর্বস্তরে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা বোর্ডগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে “ফল বিপর্যয়” না বললেও, শিক্ষার্থী-অভিভাবক মহলে এই শব্দটাই ঘুরে ফিরে আসছে। এটি আসলে ফলাফল বিপর্যয় নয় এটি আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। দেশের ৯ টি শিক্ষা বোর্ডের অধিনে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাসের হারের ন্যায় জিপিএ ৫, শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর সংখ্যাও কমেছে। গত বৃহস্পতিবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষা দেয় ১৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩১০ জন পরীক্ষার্থী। পাস করেছে ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৫৪ জন। পাসের হার ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ; যা গতবার ছিল ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এবার গতবারের চেয়ে জিপিএ-৫ কমেছে ৩৮ হাজার ৮২৭।

তবে এই ফলাফলের পেছনে দায়ী কে? শিক্ষার্থী? শিক্ষক? নাকি গোটা শিক্ষা ব্যবস্থারই কোথাও কোনো কাঠামোগত ত্রুটি থেকে গেছে? বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল আসক্তি ও মনোযোগের অভাব রয়েছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, যা তাদের মনোযোগে প্রভাব ফেলছে। পড়াশোনায় গভীর মনোনিবেশের চেয়ে অনেকের আগ্রহ ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবমুখী। এই প্রযুক্তিগত আসক্তির প্রভাব তাদের প্রস্তুতির ওপর পড়েছে। শিক্ষার্থী অবসর সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি বিভিন্ন মোবাইল গেম খেলে সময় পার করছে। যেটি তাদের শারীরিক ও মানুষিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে। কোমলমতি শিশুরা কিশোর গ্যাং সহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতারা কিশোর গ্যাংদের বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করেছে। ফলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে তারা নেশা, নারী ঘটিত অপরাধ, এলকায় প্রভাব বিস্তার সহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজের প্রতি ঝুঁকে যাচ্ছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ঘটতি ছিল। ২০২৩ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এক নতুন শিক্ষাক্রম চালু করে। এতে মুখস্থ নির্ভরতা বাদ দিয়ে বিশ্লেষণমূলক চিন্তাভাবনা, দক্ষতা ভিত্তিক শেখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই পরিবর্তন প্রশংসনীয় হলেও এর বাস্তবায়নে ছিল প্রচুর ঘাটতি। শিক্ষার্থীরা যেমন নতুন ধারায় অভ্যস্ত হতে পারেনি, তেমনি বহু শিক্ষকও প্রশিক্ষণের অভাবে সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারেননি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব বেশি পড়েছে। শহরের তুলনায় মফস্বলের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভয়াবহ অবস্থা।

২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরা ছিল এই নতুন কারিকুলামের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যাচ। অথচ তাদের জন্য পর্যাপ্ত গাইডলাইন, অনুশীলন প্রশ্ন, মডেল টেস্ট বা মূল্যায়নের নমুনা সময়মতো সরবরাহ করা হয়নি। ফলাফল হিসেবে, পরীক্ষার হলে গিয়ে তারা নতুন ধরনের প্রশ্ন দেখে দিশেহারা হয়ে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতি ও মৌলিক ঘাটতি থেকে গিয়েছিলো। করোনা-পরবর্তী সময়েও অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ক্লাস নিতে ব্যর্থ হয়েছে বা সময়মতো সিলেবাস শেষ করতে পারেনি। যার ফলে, শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণাগুলো দুর্বল থেকে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল বা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিক্ষার্থীরা গাইড বই ও কোচিং নির্ভরতায় থেকে গেছেন। নতুন কারিকুলামে যেখানে বিশ্লেষণ, যুক্তি ও বাস্তবধর্মী দক্ষতা যাচাই করা হয়েছে, সেখানে মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনা ফলপ্রসূ হয়নি।

মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার কড়াকড়ি ও বোর্ডভিত্তিক বৈষম্য রয়ে গেছে। বিভিন্ন বোর্ডে নম্বর দেওয়ার ধরণে বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। এক বোর্ডে অনেক শিক্ষার্থী অনায়াসে পাস করলেও, অন্য বোর্ডে একই মানের উত্তর দিয়েও শিক্ষার্থীরা ফেল করেছে। আবার প্রশ্নপত্র কঠিন ছিল কি সহজ—এই নিয়েও একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যেও কারা কীভাবে খাতা মূল্যায়ন করবেন সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না। মূল্যায়নে কড়াকড়ি করার বিষয়টি সঠিক ছিলো। কিন্তু সেটি সকল বোর্ডে একই রকম হওয়া দরকার, নাহলে একেক বোর্ডের ফলাফল একেক রকমের হবে। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর অভিযোগ—কিছু বোর্ড এতটাই কড়াকড়ি করেছে যে, ভালোভাবে লেখা হয়েও নম্বর দেওয়া হয়নি। এর ফলে অনেকে অকৃতকার্য হয়েছে কিংবা কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। মূল্যায়নের কড়াকড়ি করা প্রয়োজন কিন্তু কড়াকড়ি মূল্যায়ন করতে গিয়ে কেউ যেন তার প্র্যাপ্য নাম্বার থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

অন্যদিকে, পাঠ্যবই থেকে শেখার চেয়ে শিক্ষার্থীরা এখনো বিভিন্ন শর্টকাট বা সাজেশননির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত, যা নতুন শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শিক্ষাকরা শ্রেনিকক্ষের চেয়ে প্রাইভেট কোচিংয়ের প্রতি বেশি মনযোগী। তারা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে বেশি মনযোগী না এবং সব কিছু শিখায় না। কারণ শ্রেণিকক্ষে সব কিছু শিখালে শিক্ষার্থীরা তাদের কাছে প্রাইভেট/কোচিং করতে আসবে না। সরকারকে প্রাইভেট/কোচিং ব্যবস্থা যেন শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মান নষ্ট না করে সেদিকে নজর দিতে হবে।

শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষক নয়, অভিভাবকরাও অনেকাংশে দায়ী। তারা সঠিকভাবে সন্তানদের প্রস্তুত করার দিকনির্দেশনা দেননি, এমনকি নতুন কারিকুলাম সম্পর্কেও অনেকেই জানেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব ছিল। অনেক স্কুলেই প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রশিক্ষণ বা ক্লাস টেস্ট হয়নি। এই ফলাফল আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—এটা কেবল পরীক্ষায় পাস বা ফেল নয়, বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর সংকট। ফলাফল বিপর্যয়ের দায় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিলে তা হবে একধরনের অবিচার। বরং আমাদের ভাবতে হবে—এই বিপর্যয়ের মূল কাঠামোগত সমস্যা কী, এবং তা কাটিয়ে উঠতে এখনই কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিগত সরকারের আমলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার হলে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ সুযোগ সুবিধা পেয়েছে। বিগত সময়গুলোতে সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিলো পাশের হার বাড়ানো। পাশের হার বাড়াতে গিয়ে প্রশ্ন ফাঁস, নকলের ছড়াছড়ি, খাতা মূল্যয়নের ধরন সহ বিভিন্ন অনিয়ম চালু ছিলো। পরীক্ষার খাতায় যে কোন কিছু লিখলে নাম্বার এই প্রথা চালু ছিলো। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি কালচারের সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ালেখার প্রতি উদাসীন ছিলো। হঠাৎ সেই কালচারের পরিবর্তনের ফলেও ফলাফল বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এটিকে আসলে ফলাফল বিপর্যয় বলা যায় না কারণ এটি বিগত দিনের লোকদেখানো ফলাফল নয়। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট। বর্তমান সময়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। নিজেদের সন্তানদের খেয়াল রাখতে হবে তারা যেন কোন ধরনের খারাপ কাজে জড়িয়ে না পরে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে। মোবাইল গেম থেকে দূরে রেখে মাঠে খেলাধূলা করতে পাঠাতে হবে। মাঠে খেলাধূলা করলে শারীরিক ও মানুষিক উভয় স্বাস্থ্য ভাল থাকে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করতে হবে। মফস্বলের শিক্ষকদের দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে তাদের জন্য শিক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এবারের ফলাফলে শহরের প্রতিষ্ঠানের ফলাফল মফস্বলের চেয়ে ভাল। শহরের বেসরকারি  প্রতিষ্ঠান গুলোতে এক ধরনের সিন্ডিকেট থাকে। তারা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রেজাল্ট ভাল করতে পরীক্ষার হলে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে। এসকল সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে হবে।

বোর্ডভিত্তিক মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও সমন্বয় আনতে হবে। সকল বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যেন সমান সুযোগ পায় এবং তাদের মূল্যায়নের মানদণ্ড যেন একই হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক সহায়তা ও অধ্যয়ন পরিকল্পনা তৈরি। তাদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি চালু করা।

২০২৫ সালের এসএসসি ফলাফল একটি সতর্কবার্তা—এটা শিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে পড়ে থাকা অব্যবস্থাপনার ফল। এখন সময়, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়াই, শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক নয়, জাতীয়ভাবে ভাবার। শিক্ষার মান বাড়ানো ছাড়া ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদের বিকাশ সম্ভব নয়। শুধু কাগজে কলমে লোক দেখানো পাশের হার বা শিক্ষার মান বাড়ানোর চেয়ে বাস্তবে শিক্ষার মান বাড়ানো বেশি জরুরি। এই ফলাফল আমাদের শিক্ষা নেবার সুযোগ করে দিয়েছে—তবে আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবো কিনা, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

লেখক,
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া এবং সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা

লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৫ জুলাই ২০২৫ তারিখে যায়যায়দিন, ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!